ডেভিড জোসেফ বোম ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রবাদপ্রতিম তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে পদার্থবিজ্ঞানী জে. রবার্ট ওপেনহাইমারের অধীনে কাজ করার পাশাপাশি তিনি প্লাজমা পদার্থবিদ্যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। ১৯৫১ সালে তাঁর কোয়ান্টাম তত্ত্বের বইটি প্রকাশিত হয়, যা প্রচলিত কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ব্যাখ্যার স্বচ্ছ উপস্থাপনার জন্য প্রশংসিত হয়েছিল।
কিন্তু সেই বছরই তাঁর জীবনে নেমে আসে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তখন চলছে কমিউনিজম-বিরোধী তীব্র রাজনৈতিক নির্যাতন। হাউস আন-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটিজ কমিটি বার্কলেতে তাঁর ছাত্রজীবন ও কর্মজীবনের সময়কার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে। বোম মার্কিন সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে দেওয়া অধিকার ব্যবহার করে তাঁর সহকর্মীদের নাম বলতে অস্বীকার করেন।
এর ফল হয় গুরুতর। তখন তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন। তদন্ত চলাকালীন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। পরে তাঁকে কংগ্রেসকে অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি অভিযোগ থেকে খালাস পান। কিন্তু তাঁর পেশাগত জীবন আর স্বাভাবিক হয়নি। প্রিন্সটন তাঁর চুক্তি নবায়ন করেনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে নিয়োগ করতে এগিয়ে আসেনি।
বাধ্য হয়ে বোম দেশ ছাড়েন। প্রথমে ব্রাজিল, পরে ইজরায়েল এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হন। এমনকি কয়েক বছর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাঁর পাসপোর্টও বাতিল করে রাখে। ফলে এইমাপের একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কার্যত নিজের দেশ ও বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
এই পেশাগত নির্বাসনের সময়ই বোমের চিন্তায় আসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। যে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রচলিত ব্যাখ্যা নিয়ে তিনি সদ্য একটি পাঠ্যবই লিখেছিলেন, কিছুদিনের মধ্যেই সেই ব্যাখ্যাই তাঁর কাছে দার্শনিকভাবে অসন্তোষজনক বলে মনে হতে শুরু করে। ১৯৫২ সালে তিনি দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এবং সেখানে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এক সম্পূর্ণ বিকল্প কাঠামো প্রস্তাব করেন। পরবর্তীকালে এই তত্ত্ব ‘বোমিয়ান মেকানিক্স’ বা পাইলট-ওয়েভ তত্ত্ব নামে পরিচিত হয়।
বোমের ধারণা অনুযায়ী কোয়ান্টাম কণাকে বাস্তব সত্তা হিসেবে ধরা হয়, যার নির্দিষ্ট অবস্থান ও গতিপথ রয়েছে। একটি ভৌত পাইলট ওয়েভ/নির্দেশক তরঙ্গ সেই কণার গতিকে পরিচালনা করে। ফলে এ ব্যাখ্যায় প্রচলিত ব্যাখ্যার মতো পর্যবেক্ষণের সময় কণার তরঙ্গ-ফাংশন হঠাৎ ধসে পড়ার ধারণা অপরিহার্য নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই বিকল্প তত্ত্বটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের চিরাচরিত পরীক্ষামূলক পূর্বাভাসগুলিই পুনরায় দিল।
তবে তত্ত্বটি প্রকাশের পর মূলধারার পদার্থবিদ্যায় ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়নি। রবার্ট ওপেনহাইমার সম্পর্কে প্রচলিত একটি বর্ণনায় বলা হয়, তিনি সহকর্মীদের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তত্ত্বটি খণ্ডন করতে না পারলে অন্তত সেটিকে উপেক্ষা করা যেতে পারে। কিছু বিজ্ঞানী, যেমন ভলফগ্যাং পাউলি, বোমের তত্ত্ব নিয়ে প্রাকরণিক আপত্তি তুলেছিলেন, যার জোরালো যুক্তিসম্মত জবাব বোম দিয়েছিলেন। তারপরেও দীর্ঘ সময় তাঁর কাজ উপেক্ষিতই রয়ে যায়। পেশাগত বিচ্ছিন্নতা ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগ তাঁর ধারণার প্রচারে কতটা বাধা সৃষ্টি করেছিল, সেটিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বোম তখন আমেরিকান বৈজ্ঞানিক সমাজের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন। নতুন বৈজ্ঞানিক ধারণা গ্রহণ ও আলোচনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, প্রতিষ্ঠানের সমর্থন এবং পেশাগত পরিচিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত বোম বিদেশে বসে গবেষণা ও শিক্ষকতা চালিয়ে গেলেও তাঁর কাজ দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে যায়।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে। বিশেষ করে জন বেলের উপপাদ্যের উদ্ভবের পর। তখন কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তিগত প্রশ্ন নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হল আর বোমিয়ান মেকানিক্সও আবার গুরুত্ব পেতে শুরু করল। আজ এটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি সুসংবদ্ধ ও গাণিতিকভাবে আঁটোসাঁটো বিকল্প ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত। তবে এখনও এটি সংখ্যালঘু মত।
ডেভিড বোমের জীবন প্রমাণ করে, বিজ্ঞানের ধারণা কতটা গভীরভাবে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে। তাঁর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে পেশাগত বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছিল, তা তাঁর বৈজ্ঞানিক কাজের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রচারে প্রভাব ফেলেছিল কি না এই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর দেওয়া অত সহজ নয়। তবে বোমের জীবন থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট। বৈজ্ঞানিক ধারণার মূল্যায়ন কেবল তার গাণিতিক যুক্তি বা পরীক্ষামূলক ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না; বিজ্ঞানীরা যে সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে কাজ করেন, সেটিও তাদের কাজের যাত্রাপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে প্রতিপদে।
