উচ্চকণ্ঠ বিহঙ্গ 

উচ্চকণ্ঠ বিহঙ্গ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ অক্টোবর, ২০২৬

প্রকৃতির নিজস্ব কলতানে পাখির ডাক কখনও মিষ্টি, কখনও তীক্ষ্ণ, আবার কখনও তা যন্ত্রের বিকট শব্দকেও টেক্কা দিতে পারে। সম্প্রতি ১২৩টি প্রজাতির পাখির ডাক পরিমাপ করে এমনই দুই পাখির সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যাদের ডাক বিশ্বের সবচেয়ে জোরালো পাখির কণ্ঠস্বরের শিরোপার অন্যতম দাবিদার। ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী জেফ পোডোস এবং তাঁর প্রাক্তন গবেষক-ছাত্র জোয়াও সি. টি. মেনেজেসের এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ইভোলিউশান পত্রিকায়।

বন্য পরিবেশে পাখির ডাক কতটা জোরালো, তা নির্ভুলভাবে মাপা সহজ নয়। কারণ, শব্দের উৎস থেকে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দের তীব্রতা কমে যায়। তাই শুধু শব্দের মাত্রা মাপলেই চলে না, ডাক দেওয়ার মুহূর্তে পাখিটি কত দূরে রয়েছে, সেটিও জানা জরুরি। পরীক্ষাগারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এই কাজ সম্ভব হলেও বিভিন্ন দেশের অসংখ্য প্রজাতির পাখিকে ধরে পরীক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন।

এই সমস্যার সমাধানে গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন গলফ খেলার জন্য তৈরি নির্ভুল লেজার দূরত্বমাপক যন্ত্র এবং বহনযোগ্য উচ্চ-নির্ভুলতার শব্দমাপক যন্ত্র। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ও ব্রাজিলের বিভিন্ন অঞ্চলে সরেজমিনে গবেষণা চালিয়ে তাঁরা ১২৩টি প্রজাতির পাখির ডাকের তীব্রতা পরিমাপ করেন। এর মধ্যে ১১৩টি প্রজাতির ডাকের শব্দমাত্রা সম্পর্কে আগে কোনও নথিবদ্ধ তথ্য ছিল না।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পাখিদের ডাকের তীব্রতায় প্রায় ৫৮ ডেসিবেলের পার্থক্য রয়েছে। অপেক্ষাকৃত মৃদু কণ্ঠের একটি হামিংবার্ডের ডাকের তীব্রতা প্রায় ৬৪ ডেসিবেল, যা সাধারণ কথোপকথনের শব্দের কাছাকাছি। অন্যদিকে, বেয়ার-থ্রোটেড বেলবার্ড এবং রেড-লেগড সিরিয়েমা—এই দুই পাখির ডাকের সর্বোচ্চ তীব্রতা ১২০ ডেসিবেলেরও বেশি। ফলে গবেষণায় পরিমাপ করা প্রজাতিগুলির মধ্যে তারা সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ পাখিদের তালিকায় উঠে এসেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে পোডোসের গবেষণায় আমাজনের হোয়াইট বেলবার্ড-এর ডাক বিশ্বের সবচেয়ে জোরালো পাখির ডাক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। নতুন গবেষণায় উঠে আসা দুই প্রজাতি সেই তালিকায় নতুন দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পাখিদের শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বড় দেহের পাখিরা সাধারণত বেশি জোরে ডাকতে পারে। বড় পেশি বেশি পরিমাণ বায়ু সংকুচিত করে বাইরে বের করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, ঠোঁটের ফাঁক যত প্রশস্ত, ডাকের তীব্রতাও তত বেশি হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অনেকটা ট্রাম্পেটের প্রশস্ত মুখের মতো, যা শব্দকে দূরে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।

তবে কেন বিবর্তনের ধারায় কিছু পাখি এত উচ্চকণ্ঠ হয়ে উঠেছে, তার স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি। ঘন জঙ্গলে বাস, দুর্বল উড়ানক্ষমতা কিংবা একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে প্রজননের প্রবণতা – এসবের সঙ্গে জোরালো ডাকের সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা থাকলেও গবেষণায় তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞানীদের মতে, পাখির শারীরিক গঠন কীভাবে তাদের ডাকের তীব্রতাকে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে ধারণা মিললেও এর পরিবেশগত ও বিবর্তনীয় কারণ বুঝতে আরও বহু প্রজাতির ওপর গবেষণা প্রয়োজন।

সূত্র: https://scitechdaily.com/biologists-may-have-discovered-two-of-the-worlds-loudest-birds/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 1 =