শুধু নেকড়েরা ইয়েলোস্টোনকে বাঁচায়নি 

শুধু নেকড়েরা ইয়েলোস্টোনকে বাঁচায়নি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েলোস্টোন জাতীয় উদ্যানের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নেকড়েদের প্রত্যাবর্তনকে পরিবেশ সংরক্ষণের এক অনন্য সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। বহুল প্রচারিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে নেকড়েদের ফিরিয়ে আনার পর থেকে সেখানকার হরিণের সংখ্যা কমতে থাকে, গাছপালার পুনরুত্থান ঘটে এবং নদীর ধারে বসবাসকারী নিশাচর স্তন্যপায়ী প্রাণী বীভাররাও বাঁধ নির্মাণের পরিবেশ ফিরে পায়। কিন্তু দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের গবেষণা বলছে, বাস্তব ছবিটি এত সরল নয়। দ্য কনভারসেশন-এ এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রোজেলিও লুক-লোরার প্রকাশিত নিবন্ধে উঠে এসেছে এই বিশেষ পর্যবেক্ষণ।

ইয়েলোস্টোনের প্রায় ৩৫০০ বর্গমাইল বিস্তৃত অঞ্চলে ১৯২০-এর দশকে নেকড়েদের নির্মূল করা হয়েছিল। তাদের অনুপস্থিতিতে এল্ক বা প্রকাণ্ড হরিণ প্রজাতির হরিণের সংখ্যা খুব বেড়ে যায়। অতিরিক্ত চারণে নদীতীরবর্তী উইলো ও অ্যাসপেন গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, বীভারদের বাঁধ ও জলাভূমির পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৯৫ সালে নেকড়েদের পুনঃপ্রবর্তনের পর ধারণা করা হয়, তারা এল্কের সংখ্যা কমিয়ে, তাদের নদী উপত্যকা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে গাছপালার পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছে। ঝোপঝাড় বাড়ায় বীভাররা ফিরে এসেছে, আর তাদের উপস্থিতি বাস্তুতন্ত্রকে আরও সমৃদ্ধ করেছে—এমনটাই ধারণা।

এই ধারণার প্রধান ভিত্তি হল ট্রফিক ক্যাসকেড বা খাদ্যশৃঙ্খলের ধারাবাহিক প্রভাব। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা শিকারির সংখ্যা বাড়লে তার প্রভাব ক্রমশ নীচের স্তরগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু নতুন তথ্য দেখাচ্ছে, ইয়েলোস্টোনে গাছপালার পুনরুদ্ধার সীমিত এবং স্থানভেদে অসম। এল্কের সংখ্যা কমাতে শুধু নেকড়ে নয়, মানুষ, ভালুক ও পার্বত্য সিংহেরও ভূমিকা রয়েছে। ফলে নেকড়েদের একক অবদানকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। উদ্যানের প্রধান নেকড়ে-বিশেষজ্ঞের মতানুসারে, এই প্রভাবকে ব্যাপক ট্রফিক ক্যাসকেড-এর বদলে সীমিত ট্রফিক ট্রিকল বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এল্ক যে সব সময় নেকড়ের ভয়েই নিরাপদ চারণভূমি ছেড়ে পালায়, এমন ধারণাও ঠিক নয়। ক্ষুধার তাগিদে তারা শিকারির উপস্থিতি উপেক্ষা করেও ভালো খাদ্যের সন্ধান করতে পারে।

তাহলে সরল এই কাহিনি এত জনপ্রিয় কেন? এর একটি কারণ, মানুষ প্রকৃতিকে ঘড়ির কাঁটায় চলা এক সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা হিসেবে কল্পনা করতে ভালোবাসে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করার জন্য মানুষকেই দায়ী করার এবং মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া প্রকৃতির স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার ঘটায় বিশ্বাস করার প্রবণতা রয়েছে। অথচ নেকড়েদের কানাডা থেকে বিমানে আনা হয়েছিল এবং আশপাশে বীভারদেরও পরিকল্পিতভাবে ছাড়া হয়েছিল। জনপ্রিয় ভিডিওতে মানুষের এই উদ্যোগগুলি প্রায় অনুল্লিখিত।

লেখকের বক্তব্য, নেকড়েদের সংরক্ষণ করার জন্য তাদের দিয়ে বাস্তুতন্ত্রকে সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার করানোর প্রমাণ করা নিষ্প্রয়োজন। প্রকৃতিকে ভালোবাসা এবং তার প্রতি মমত্ববোধও সংরক্ষণের বড়ো কারণ। প্রকৃতি কোনও স্থির, নিখুঁত যন্ত্র নয়; এটি পরিবর্তনশীল, জটিল ও অনিশ্চিত। তাই আবেগকে অস্বীকার না করে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃতিকে বোঝাই হওয়া উচিত সংরক্ষণের প্রকৃত পথ।

সূত্রঃ Adapted from an article originally published in The Conversation.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 4 =