উদ্ভিজ্জ খাদ্য ও যকৃতের বিপাকক্রিয়া 

উদ্ভিজ্জ খাদ্য ও যকৃতের বিপাকক্রিয়া 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় কত দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে, তারই প্রমাণ মিলল জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়। দেখা গেছে, প্রাণীজ প্রোটিনযুক্ত খাবার বদলে সম্পূর্ণ উদ্ভিজ্জ প্রোটিননির্ভর খাদ্যের অভ্যাস করার মাত্র দু’দিনের মধ্যেই ইঁদুরের যকৃতে বিপাকীয় পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে রক্তে শর্করা তৈরির প্রক্রিয়া এবং শরীর থেকে বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণের দক্ষতা কমে যায়। গবেষণাটি সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে মলিকিউলার মেটাবলিজিম পত্রিকায়।

প্রোটিন শরীরের গঠন ও স্বাভাবিক কার্যকলাপ বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান। উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় উৎস থেকেই প্রোটিন পাওয়া যায়। তবে উৎসভেদে প্রোটিন গঠনকারী অ্যামিনো অ্যাসিডের ধরন ও অনুপাত আলাদা হয়। বিশেষত, উদ্ভিজ্জ প্রোটিনে সাধারণত শাখাবিশিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিডের পরিমাণ প্রাণীজ প্রোটিনের তুলনায় কম থাকে। এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলি শরীরের প্রোটিন তৈরির পাশাপাশি যকৃতে গ্লুকোজ উৎপাদনেও ভূমিকা রাখে। উপবাসের সময় রক্তে শর্করার মাত্রা বজায় রাখতে এই গ্লুকোজ গুরুত্বপূর্ণ।

এই গবেষণাটি হয়েছে মূলত ইঁদুরের দু-ধরনের খাদ্যাভ্যাসের তুলনার ভিত্তিতে। একটিতে ছিল উদ্ভিজ্জ ও প্রাণীজ—উভয় ধরনের প্রোটিনযুক্ত নিরামিষ খাবার, অন্যটিতে ছিল সম্পূর্ণ উদ্ভিজ্জ প্রোটিননির্ভর খাবার। দেখা যায়, মাত্র দু’দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ উদ্ভিজ্জ খাদ্য গ্রহণকারী ইঁদুরের যকৃতে গ্লুকোজ তৈরির দক্ষতা কমে যায়। পাশাপাশি, তাদের যকৃৎ অ্যামোনিয়া অপসারণেও কম কার্যকর হয়ে ওঠে। অ্যামোনিয়া হলো অ্যামিনো অ্যাসিড ভাঙার সময় উৎপন্ন একটি বিষাক্ত পদার্থ। শরীরে এর মাত্রা বেড়ে গেলে তা ক্ষতিকর হতে পারে। ইঁদুরগুলির শারীরিক সক্রিয়তাও কমে যায়।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে গবেষকেরা চিহ্নিত করেছেন গ্লুটামেট ডিহাইড্রোজেনেজ বা জিডিএইচ (GDH) নামের একটি উৎসেচককে। কোষীয় অঙ্গাণু মাইটোকন্ড্রিয়ায় অবস্থিত এই উৎসেচকটি প্রোটিনের বিপাক এবং শর্করা উৎপাদনের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে।

জিডিএইচ-হীন ইঁদুরগুলির যকৃতে সম্পূর্ণ উদ্ভিজ্জ প্রোটিননির্ভর খাদ্য গ্রহণের ফলে অ্যামোনিয়ার বিপজ্জনক মাত্রায় সঞ্চয় এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা যায়। প্রাণীজ প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণকারী ইঁদুরের তুলনায় তাদের অবস্থা ছিল বেশি গুরুতর। এ থেকে যকৃতের বিপাকীয় ভারসাম্য বজায় রাখার কাজে জিডিএইচের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত হয়।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, খাদ্যাভ্যাস বদলানোর প্রভাব দ্রুত দেখা দিলেও ইঁদুরের শরীরে তা আবার দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে। প্রাণীজ প্রোটিন পুনরায় খাদ্যতালিকায় ফিরিয়ে আনলে এক থেকে দু’দিনের মধ্যে বিপাকীয় পরিবর্তনগুলি উল্টে যেতে দেখা গেছে।

গবেষণাটি হয়েছিল ইঁদুরের উপর। মানুষের শরীরেও একই পরিবর্তন ঘটবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। গবেষকদের পরামর্শ, সম্পূর্ণ উদ্ভিজ্জ খাদ্য গ্রহণকারীদের বাদাম, টোফু ও মুসুরির ডালের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ভিটামিনের পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করা উচিত।

খাদ্যের উৎস পরিবর্তনের সঙ্গে মানব স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিপাকীয় ব্যবস্থারও দ্রুত অভিযোজন ঘটতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

মোটকথা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবেশগত ও নৈতিক দিকগুলির পাশাপাশি শরীরের বিপাকীয় চাহিদা সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি।

 

সূত্র: “Transition to dietary plant-based proteins requires functional liver GDH for proper control of ammonia and energy homeostasis” by Julijana Ivanisevic, Pierre Maechler, et.al; 4th September 2026, published in Molecular Metabolism.

DOI: 10.1016/j.molmet.2026.102435

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − ten =