সদ্য প্রসূতির মানসিক চাপ

সদ্য প্রসূতির মানসিক চাপ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের জীবনযাত্রায় নানা পরিবর্তন আসে। এই সময় আর্থিক অনটন, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব ও মানসিক চাপ শুধু মায়ের সুস্থতাকেই প্রভাবিত করে না, সন্তানের প্রতি তাঁর আচরণেও পরিবর্তন আনতে পারে। সম্প্রতি ইঁদুরের ওপর করা একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রসবের পর প্রতিকূল পরিবেশে থাকা মায়েদের মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু স্নায়ুকোষ সন্তানের প্রতি রুক্ষ আচরণের সময় দীর্ঘক্ষণ সক্রিয় থাকে। তবে এই পরিবর্তন মস্তিষ্কের সব ধরনের আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত নয়। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব নিউরোসায়েন্স পত্রিকায়।

গবেষণায় টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ১৭টি সদ্য মা হওয়া ইঁদুরকে নিয়ে পরীক্ষা করেন। সন্তান জন্মের দু’দিন পর তাদের দুটি দলে ভাগ করা হয়। এক দলকে পর্যাপ্ত বিছানা তৈরির উপকরণ ও বাসা বানানোর সামগ্রী দেওয়া হয়। অন্য দলকে দেওয়া হয় অনেক কম বিছানার উপকরণ, যাতে তারা স্বাভাবিকভাবে বাসা তৈরি করতে না পারে।

দেখা যায়, কম উপকরণ পাওয়া ইঁদুর-মায়েরা সন্তানদের কম সময় ধরে চেটে পরিচর্যা করেছে এবং খাইয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা সন্তানদের ওপর বেশিবার পা তুলে দিচ্ছিল এবং তুলনামূলকভাবে রুক্ষ আচরণ করছিল। যদিও দুই দলের মা ও সন্তানদের ওজন প্রায় একই ছিল, তাদের পরিচর্যার ধরনে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।

এরপর গবেষকেরা মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত ‘ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া’ নামের একটি অঞ্চলের স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন। এই কোষগুলি ডোপামিন নামের রাসায়নিক বার্তাবাহক নিঃসরণ করে, যা প্রেরণা, আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে কোষগুলির সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করা হল।

গবেষকেরা ভেবেছিলেন, প্রতিকূল পরিবেশে থাকা মায়েদের সন্তানকে আদর করার সময় এই কোষগুলির কার্যকলাপ কমে যাবে। কিন্তু ফলাফল ছিল ভিন্ন। দুই দলের মায়েরাই সন্তানকে চাটা বা পরিচর্যা করার সময় প্রায় একই রকম স্নায়বিক সক্রিয়তা দেখিয়েছিল। পার্থক্য দেখা গেল সন্তানদের ওপর পা চাপানো, টেনে সরানো বা ধাক্কা দেওয়ার মতো আচরণের সময়। কম উপকরণ পাওয়া মায়েদের স্নায়ুকোষগুলি এ সময় তুলনামূলকভাবে দীর্ঘক্ষণ সক্রিয় ছিল। তবে সক্রিয়তার সর্বোচ্চ মাত্রা বাড়েনি।

এই পার্থক্য প্রসবের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে দেখা যায়নি; চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে তা স্পষ্ট হয়। অর্থাৎ, প্রতিকূলতার প্রভাব ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে। আবার খাবার হিসেবে শস্য জাতীয় খাদ্য দেওয়া হলে দুই দলের মায়েদের মস্তিষ্কেই একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তাই চাপের কারণে তাদের আনন্দ অনুভবের সামগ্রিক ক্ষমতা কমে গিয়েছিল, এমন প্রমাণ মেলেনি।

গবেষকদের মতে, প্রতিকূল পরিবেশ মায়ের মস্তিষ্কের কার্যকলাপকে সরলভাবে কমিয়ে দেয় না; বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী তার প্রতিক্রিয়া বদলে যেতে পারে। তবে গবেষণাটি মাত্র ১৭টি ইঁদুরের ওপর করা হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে একই পরিবর্তন ঘটে কি না, তা এখনও অজানা। ভবিষ্যতে এই গবেষণা প্রসব-পরবর্তী মানসিক চাপের প্রভাব বুঝতে এবং মা ও শিশুর জন্য উপযুক্ত সহায়তা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।

সূত্র: Maternal stress can alter brain activity associated with caregiving. Credit: ShutterstockOctober 25, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine + four =