বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে এমন কিছু কোষ জমতে থাকে, যেগুলি আর বিভাজিত হয় না, অথচ জীবিত থেকে নানা ক্ষতিকর পদার্থ তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা এদের নাম দিয়েছেন ‘জম্বি কোষ’। এই মৃতপ্রায় কোষগুলি দীর্ঘদিন শরীরে থেকে প্রদাহ বাড়ায় এবং বিভিন্ন বয়সজনিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। সম্প্রতি আমেরিকার অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনের গবেষকেরা আবিষ্কার করেছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের কোষের বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে রোগপ্রতিরোধী কোষগুলি সহজে জম্বি কোষগুলিকে সরিয়ে দিতে পারে না। নেচার এজিং পত্রিকায় গবেষণাটির বিবরণ সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে। ওই প্রক্রিয়াটি সক্রিয় করতে পারলে ইঁদুরের শরীরে জম্বি কোষের সংখ্যা, প্রদাহ ও টিস্যুর ক্ষতচিহ্ন কমানো সম্ভব।
কোনও আঘাত লাগলে বা টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিছু কোষ বিভাজন বন্ধ করে দেয়। এই অবস্থাকে বলে কোষ জরা বা সেলুলার সেনেসেন্স। এমন কোষ থেকে নির্গত কিছু রাসায়নিক পদার্থ ক্ষত সারাতে সাহায্য করে এবং রোগপ্রতিরোধী কোষকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনে। কাজ শেষ হলে ম্যাক্রোফেজ নামের রোগপ্রতিরোধী কোষ সাধারণত এই অকেজো কোষগুলিকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে জম্বি কোষগুলি শরীরে থেকে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও টিস্যুর ক্ষতি ঘটায়।
গবেষকেরা দেখেছেন, এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত চ্যাপেরোন-মিডিয়েটেড অটোফ্যাজি (CMA) নামের একটি প্রক্রিয়া। এর সাহায্যে কোষ নির্দিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত বা অপ্রয়োজনীয় প্রোটিন ভেঙে পুনর্ব্যবহার করে। বয়স বাড়লে এই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা কমে যায়।
তরুণ ও বয়স্ক ইঁদুরের কোষ তুলনা করে গবেষকেরা দেখেন, তরুণ কোষে জম্বি কোষের বৈশিষ্ট্য তৈরি হলে CMA-র সক্রিয়তা বাড়ে। কিন্তু বয়স্ক কোষে তা হয় না। ফলে ক্ষতিকর প্রোটিন জমে এবং এমন পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা পাশের সুস্থ কোষকেও জম্বি কোষে পরিণত করতে পারে। একই সঙ্গে বয়স্ক ইঁদুরের ম্যাক্রোফেজের জম্বি কোষ শনাক্ত ও গ্রাস করার ক্ষমতা কমে।
এরপর গবেষকেরা CA77.1 নামের একটি পরীক্ষামূলক রাসায়নিক ব্যবহার করেন, যা CMA-র কার্যকারিতা বাড়ায়। পাঁচ মাস ধরে বয়স্ক ইঁদুরকে এটি খাওয়ানোর পর তার বিভিন্ন অঙ্গে জম্বি কোষের সংখ্যা কমে যায়। প্রদাহ ও টিস্যুতে দাগের মতো তন্তুময় কলা জমার প্রবণতাও হ্রাস পায়। পরীক্ষাগারে এই রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে বয়স্ক ইঁদুরের ম্যাক্রোফাজের কোষ গ্রাস করার ক্ষমতাও তরুণ ইঁদুরের সমতুল্য হয়ে ওঠে।
গবেষকেরা ফুসফুসের ইডিওপ্যাথিক পালমোনারি ফাইব্রোসিস নামের একটি গুরুতর রোগ নিয়েও পরীক্ষা করেন। এই রোগে ফুসফুসে ধীরে ধীরে দাগের মতো কোষকলা জমে শ্বাসকষ্ট হয়। রোগীদের ফুসফুসের নমুনায় CMA-র কার্যকারিতা কম দেখা যায়। ফুসফুসে আঘাতের পর ইঁদুরকে CA77.1 দেওয়ায় প্রদাহ, জম্বি কোষ ও টিস্যুর ক্ষতচিহ্ন কমে।
তবে গবেষণার অধিকাংশ ফলাফল ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় পাওয়া। মানুষের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে জম্বি কোষকে সরাসরি ধ্বংস করার বদলে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে সেগুলিকে সরিয়ে দেওয়ার নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরি হতে পারে।
সূত্র: “Decline of chaperone-mediated autophagy in aging impairs macrophage clearance of senescent cells” by Rebecca Sereda, Kristen Lindenau, Antonio Diaz ,5 October 2026, Nature Aging. DOI: 10.1038/s43587-026-01240-w
