মানুষ ও শিম্পাঞ্জির ডিএনএ-র প্রায় ৯৯ শতাংশের মিল রয়েছে। অথচ মানুষের মস্তিষ্ক শিম্পাঞ্জির মস্তিষ্কের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বড়। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও এই দুই প্রজাতির মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশে এই পার্থক্য তৈরি হল কীভাবে? সম্প্রতি গবেষকেরা মানুষের জিনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভাইরাসের চিহ্ন খুঁজে পেয়ে এই প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
গবেষকদের মতে, প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার কোনো এক প্রজাতির বনমানুষের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছিল। কিছু কিছু ভাইরাস সংক্রমণের সময় নিজেদের ডিএনএ-র অংশ পোষকের জিনগত উপাদানের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারে। এর ফলে পোষক কোষ ভাইরাসের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সংক্রমণ সেরে গেলেও ভাইরাসের এই ডিএনএ কোষে থেকে যেতে পারে। কালে তা জিনোমের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।
গবেষকেরা শিম্পাঞ্জির জিনোমে এমন প্রাচীন ভাইরাসের ডিএনএ-র ১৫৮টি অবস্থান খুঁজে পেয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষের জিনোমে কিন্তু সেই ভাইরাসের ডিএনএ অনুপস্থিত। এই পার্থক্যটাই দুই প্রজাতির মস্তিষ্কের বিবর্তনের সূত্র খুঁজতে গবেষকদের সাহায্য করেছে।
বিষয়টি পরীক্ষা করতে গবেষকেরা জিন সম্পাদনার CRISPR প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিম্পাঞ্জির স্টেম সেল থেকে ভাইরাসের ওই ডিএনএ-র অংশ সরিয়ে দেন। স্টেম সেল হল এমন এক ধরনের সাধারণ কোষ, যা থেকে বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত কোষ তৈরি হতে পারে। দেখা যায়, ভাইরাসের ডিএনএ সরিয়ে দেওয়ার পর LINC00662 নামের একটি জিন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সাধারণত মানুষের কোষে এই জিন সক্রিয় থাকলেও শিম্পাঞ্জির কোষে তা সক্রিয় থাকে না।
আরও দেখা যায়, LINC00662 জিনটি সক্রিয় হলে স্নায়ুকোষ বিকাশের পৃষ্ঠপোষক অন্যান্য জিনের কার্যকলাপও বেড়ে যায়। বিপরীতে, মানুষের কোষে এই জিন নিষ্ক্রিয় করে দিলে স্নায়ুকোষের বিকাশে সহায়ক জিনগুলির কার্যকলাপ আর একইভাবে বাড়ে না।
গবেষক জোহান ইয়াকবসনের মতে, প্রাচীন ভাইরাসের ডিএনএ কীভাবে মানুষের ও শিম্পাঞ্জির মধ্যে কোনও জিনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী পার্থক্য তৈরি করতে পারে, এই গবেষণা তারই প্রমাণ। বিবর্তনের পথে এই পরিবর্তনই মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
তবে এই গবেষণা থেকে এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ভাইরাসের ডিএনএ-র এই পরিবর্তনই মানুষের বৃহত্তর মস্তিষ্কের একমাত্র কারণ। এটি বিবর্তনের জটিল প্রক্রিয়ায় একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মাত্র।
সূত্রঃ্: ScienceAdviser, 28 October 2026.
