মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগের সঙ্গে যে প্রোটিনের যোগসূত্র রয়েছে, সেই অ্যামাইলয়েডই শুক্রাণুর ভিতরে জিনগত উপাদান পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়! কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জাকারম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষকদের নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই চমকপ্রদ তথ্য। মলিকিউলার সেল পত্রিকায় প্রকাশিত এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে জিন সম্পাদনার প্রযুক্তি, বিশেষত ক্রিসপার (CRISPR)-কে, আরও উন্নত করার পথ দেখাতে পারে। গবেষণার সূত্রপাত হয়েছিল এইচআইভি ভাইরাসকে কেন্দ্র করে। বিজ্ঞানীরা আগেই দেখেছিলেন, বীর্যরসে থাকা অ্যামাইলয়েড তন্তু এইচআইভি-কে প্রজননতন্ত্রের কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। বিষয়টি ভাবিয়েছিল গবেষক উইলিয়াম ম্যালেন ও তাঁর সহকর্মী, অ্যামাইলয়েড বিশেষজ্ঞ ডক্টর ফিৎজপ্যাট্রিককে। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, এই প্রোটিন কি শরীরের অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ উপাদানকেও শুক্রাণুর ভিতরে পৌঁছে দিতে পারে? সেই উপাদান হল আরএনএ। ডিএনএ-তে থাকা জিনগত নির্দেশ অনুযায়ী প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে এই অণু। বীর্যরসে প্রচুর পরিমাণে ক্ষুদ্র আরএনএ থাকে। ধারণা করা হয়, ভ্রূণের বিকাশের সময় কোন জিন সক্রিয় থাকবে আর কোনটি নিষ্ক্রিয়, তা নিয়ন্ত্রণেও এদের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এই আরএনএ কীভাবে শুক্রাণুর ভিতরে পৌঁছয়, তা এত দিন অজানা ছিল। গবেষকদের নজরে আসে অ্যামাইলয়েড ও আরএনএ-র বৈদ্যুতিক ধর্ম। অ্যামাইলয়েড ধনাত্মক আধানযুক্ত, অন্যদিকে আরএনএ ঋণাত্মক আধানযুক্ত। ফলে চুম্বকের বিপরীত মেরুর মতো তারা পরস্পরকে আকর্ষণ করে। পরীক্ষায় দেখা যায়, অ্যামাইলয়েড তন্তু আরএনএ-কে আঁকড়ে ধরতে পারে। শুধু তাই নয়, ভঙ্গুর আরএনএ-কে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা করার কাজও করতে পারে এই মজবুত প্রোটিন কাঠামো। এরপর ক্রায়ো-ইলেকট্রন টোমোগ্রাফি প্রযুক্তির সাহায্যে হিমায়িত শুক্রাণুর ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরি করেন বিজ্ঞানীরা। তাতে দেখা যায়, অ্যামাইলয়েড তন্তু শুধু শুক্রাণুর গায়ে আটকে থাকছে না, একেবারে কোষের ভিতরে প্রবেশ করছে। পরীক্ষায় আরও দেখা যায়, অ্যামাইলয়েডের উপস্থিতিতে শুক্রাণুর মধ্যে আরএনএ প্রবেশের হার অনেক বেড়ে যায়। কোষের ভিতরে পৌঁছনোর পর ক্লাস্টারিন নামের একটি প্রোটিন অ্যামাইলয়েড থেকে আরএনএ-কে আলাদা করতেও সাহায্য করে। এই আরএনএ শুক্রাণুর ভিতরে গিয়ে ঠিক কী কাজ করে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বীর্যরসের আরএনএ সন্তানের শরীরে কিছু জিনের সক্রিয়তা বদলে দিতে পারে। অর্থাৎ বাবা-মায়ের জীবনযাপন বা অভিজ্ঞতার প্রভাব জিনের কার্যকারিতায় পরিবর্তন ঘটিয়ে পরবর্তী প্রজন্মেও পৌঁছতে পারে। ইঁদুরের উপর গবেষণায় বাবার দিক থেকে ইনসুলিন প্রতিরোধের মতো বিপাকীয় সমস্যার উত্তরাধিকারেও আরএনএ-র ভূমিকার ইঙ্গিত মিলেছে। ভবিষ্যতে অ্যামাইলয়েডকে ব্যবহার করে কোষের ভিতরে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় আরএনএ বা জিনগত উপাদান পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। পরীক্ষায় অ্যামাইলয়েডের সাহায্যে শুধু ছোট আরএনএ নয়, সবুজ ফ্লুরোসেন্ট প্রোটিন তৈরির নির্দেশ বহনকারী বড় আরএনএ-ও শুক্রাণুর ভিতরে ঢোকানো সম্ভব হয়েছে। এই শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত ভ্রূণে সংশ্লিষ্ট প্রোটিনের উৎপাদন হয় অ্যামাইলয়েডের সাহায্য ছাড়া নিষিক্ত ভ্রূণের তুলনায় অন্তত ১০ গুণ বেশি। বর্তমানে জিন সম্পাদনার প্রযুক্তি ক্রিসপার-সহ নানা জিন-চিকিৎসায় জিনগত উপাদান কোষে পৌঁছে দিতে অনেক সময় পরিবর্তিত ভাইরাস ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তাতে আবার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। মানুষের শরীরেই তৈরি অ্যামাইলয়েড তন্তু বিকল্প বাহক হিসেবে কাজ করতে পারবে, তা নিয়ে আশাবাদী গবেষকরা। তবে চিকিৎসায় এর ব্যবহার কতটা নিরাপদ ও কার্যকর, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: Mallen, W. S., et al. (2026) Amyloid-mediated RNA uptake by sperm for embryonic delivery Molecular Cell DOI: 10.1016/j.molcel.2026.10.004
