স্পর্শ ছাড়াই শক্তি হারাচ্ছে ন্যানো-সেন্সর

স্পর্শ ছাড়াই শক্তি হারাচ্ছে ন্যানো-সেন্সর

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ নভেম্বর, ২০২৬

অতি সূক্ষ্ম কম্পন শনাক্তকারী ন্যানো-সেন্সরগুলির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার এক অপ্রত্যাশিত কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এর জন্য অন্য কোনও বস্তুর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শের প্রয়োজন হয় না। সুইজারল্যান্ডের ই পি এফ এল-এর গবেষকরা দেখিয়েছেন, ন্যানো-আকারের কম্পনশীল যন্ত্রের কাছাকাছি কয়েকশো ন্যানোমিটার দূরত্বে কোনও অন্তরক পদার্থ থাকলেই তার কম্পন থেকে শক্তি ক্ষয় হতে পারে। এর ফলে যন্ত্রটির কার্যক্ষমতা বা মেকানিক্যাল কোয়ালিটি ফ্যাক্টর দশ গুণ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

ন্যানোমেকানিক্যাল রেজোনেটর হল চিপের ওপর তৈরি অতি ক্ষুদ্র কম্পনশীল যন্ত্র। ভর, বল, তাপমাত্রা ও চাপের সামান্য পরিবর্তনও শনাক্ত করতে পারে বলে অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিমাপের কাজে এগুলি ব্যবহৃত হয়। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ফিল্টার, চিপ-ভিত্তিক ঘড়ি এবং ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতেও এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এই যন্ত্রগুলির অতি সূক্ষ্ম কম্পন ধরে রাখার ক্ষমতার পথে এত দিন কিছু বাধা বা সীমাবদ্ধতা ছিল। এবার সেইসব উপেক্ষিত বাধার একটির সন্ধান পেলেন গবেষকরা।

গবেষণার বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার ফিজিক্স পত্রিকায়। সেখানে গবেষকরা তুলে ধরেছেন, এই শক্তিক্ষয়ের নেপথ্যে রয়েছে এক ধরনের বৈদ্যুতিক মিথস্ক্রিয়া। ন্যানো-রেজোনেটরের ভেতরে কিছু স্থির বৈদ্যুতিক আধান আটকে থাকে। যন্ত্রটি কম্পিত হলে সেই আধানগুলিও তার সঙ্গে নড়াচড়া করে এবং চারপাশে পরিবর্তনশীল বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে। কাছাকাছি সিলিকন ডাই-অক্সাইড বা সিলিকন নাইট্রাইডের মতো অন্তরক পদার্থ থাকলে এই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের সঙ্গে পদার্থটির মিথস্ক্রিয়া ঘটে। এর ফলে কম্পনশীল যন্ত্রের কিছু শক্তি তাপ বা অন্য রূপে অপচয় হয়। অথচ দুই বস্তুর মধ্যে কোনও সরাসরি সংস্পর্শ ঘটে না। এই ঘটনাকে বলা হয় ‘নন-কনট্যাক্ট ফ্রিকশন’ বা স্পর্শহীন ঘর্ষণ।

বিষয়টি পরীক্ষার জন্য গবেষকরা সিলিকন নাইট্রাইডের তৈরি সূক্ষ্ম তারের মতো কাঠামো ব্যবহার করেন। এগুলিকে একটি অন্তরক স্তরের প্রায় ৫০০ ন্যানোমিটার ওপরে ঝুলিয়ে রেখে তাদের কম্পন পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা যায়, কম কম্পাঙ্কের কম্পনগুলি তুলনায় বেশি শক্তি হারাচ্ছে। গবেষকদের তৈরি তাত্ত্বিক মডেলের পূর্বাভাসের সঙ্গেও এই ফল মিলে যায়।

দ্বিতীয় পরীক্ষায় অত্যন্ত উচ্চ কোয়ালিটি ফ্যাক্টরসম্পন্ন রেজোনেটর/অনুরণক ব্যবহার করা হয়। দুটি আলো-কেলাস গহ্বর বা ফোটোনিক ক্রিস্টাল ক্যাভিটির মাঝখানে কম্পনশীল তারগুলিকে স্থাপন করে তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব কয়েকশো ন্যানোমিটারে নামিয়ে আনা হয়। দেখা যায়, দূরত্ব কমার সঙ্গে সঙ্গে রেজোনেটরের কোয়ালিটি ফ্যাক্টর দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে তা দশ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।

এই আবিষ্কার ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও অতি সংবেদনশীল পরিমাপক যন্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই ধরনের যন্ত্রকে প্রায়ই অন্য কাঠামোর খুব কাছাকাছি রেখে কাজ করাতে হয়। ফলে নকশা তৈরির সময় আটকে থাকা বৈদ্যুতিক আধান এবং অন্তরক পদার্থের বৈদ্যুতিক শক্তিক্ষয়ের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হয়। একই সঙ্গে এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অতি পাতলা পদার্থের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করার নতুন পথও খুলতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অদৃশ্য শক্তিক্ষয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ভবিষ্যতে আরও নির্ভুল সেন্সর ও উন্নত কোয়ান্টাম যন্ত্র তৈরিতে সাহায্য করবে।

সূত্র: “Non-contact friction in ultracoherent nanomechanical resonators near dielectric materials” by Amirali Arabmoheghi, Alessio Zicoschi, et.al; publishrd on 7th July 2026, Nature Physics.

DOI: 10.1038/s41567-026-03350-z

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 15 =