সম্পাদকীয়

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান পত্রিকা চাই কেন ? নতুন ক’রে, নয়া আঙ্গিকে ! বেশ কিছুদিন ধ’রেই এই প্রশ্নটা নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোড়িত হয়েছি, চর্চা করেছি। প্রশ্ন করেছি– এ পত্রিকার প্রয়োজন কী ? বিশ্ব বিজ্ঞানের প্রতিদিন পালটাতে থাকা চেহারাটা আর চমক দেওয়া সব কর্মকাণ্ডের বাংলা ভাষায় ধারাবিবরণী দিয়ে গা গরম করার জন্যই এটা প্রয়োজন ? নাকি ঐতিহ্যের মর্মরধ্বনির সাথে বর্তমানের বাস্তবতার মিল হতে গিয়ে ব্যথা পাওয়া বাঙালি বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানভাবনাক্লিষ্ট মানুষজনের অভিমান ও অতৃপ্তি প্রকাশ করার জায়গা দেওয়ার জন্য তা দরকার ? বাংলা ভাষার নৌকাটা নাকি বিজ্ঞানের প্রবল স্রোতে টাল সামলে বাইতে পারেনি। চরে আটকেছে বারবার। নৌকায় জমেছে শ্যাওলা, চরে জন্মেছে দূর্বাঘাস। নৌকার যাত্রীরা উঠে গেছেন চাকচিক্যমন্ডিত সপ্তডিঙ্গা মধুকরে – ইংরাজি ভাষায়। এ কি বাংলা ভাষার দুর্বলতা ? নাকি আমরা যারা বিজ্ঞান নিয়ে নাড়াচাড়া করি, বিজ্ঞানী ব’লে পরিচিতি পাই- তাদের সত্তার দৃঢ়তা এবং নিজের ভাষার উপর ভরসার অভাবে ?

এ বিতর্ক চলতেই থাকবে- তেমনি চলতে থাকবে নতুন উদ্যোগও। ‘বিজ্ঞানভাষ’-এর ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাই যথার্থই আমাদের শুনতে হয়েছে- নতুন পত্রিকার কী প্রয়োজন ? এও শুনতে হয়েছে পুরনো উদ্যোগগুলিকেও আরও উজ্জ্বল করতে মনোযোগী হওয়াটা আরও ফলপ্রসূ হতে পারে। অনেক সমমনস্ক শুভানুধ্যায়ী দীর্ঘশ্বাসের মেদুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে উচ্চারণ করেছেন- অনেক তো এরকম চর্চা দেখলাম ! ঐ আরকি ? দেখা যাক কতদূর যায় ! “হোক-হোক–দেখা যাবে !”

আমরাও বলি হোক দেখা যাক । তারপরে এও বলি ‘হবেই’ । নতুন প্রয়াস সবসময় বিষয়টির গতিময়তার ইঙ্গিত দেয়। তাতে পুরনো, সনাতন প্রবাহ পুষ্টি পায়। একে অন্যের পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বাংলাভাষায় বিজ্ঞান চর্চার আখড়া যত বাড়বে, বিজ্ঞান পিপাসুর সংখ্যাও বাড়বে তত, আগ্রহ তৈরির সাথে সাথে। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের দৃশ্যমানতার ক্ষেত্র হবে ক্রমশঃ বিস্তীর্ণ। এতে বাংলার লাভ, লাভ বিজ্ঞানের।

প্রকৃতি আর জীবন নিয়ে নানান অবিন্যস্ত স্বপ্ন, ভেসে বেড়ানো ভাবনাকে নিবিড় পর্য্যবেক্ষণের ছাঁচে ফেলে পথ চলেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানী সুর ভাঁজেন, স্বরলিপিও বানান। কিন্তু তা আরও বেশি সংখ্যার মানুষের কাছে তাদের বোঝার মতো ক’রে পৌঁছতে না পারলে সেই সুর সীমাবদ্ধ থাকে। আর মানুষজনও বিজ্ঞানকে ভাবে বিজ্ঞানীদের সম্পত্তি- প্রতিদিনের জীবনের বিষয় নয়। বিজ্ঞানীকুলও সাধারণ মানুষের ভাবনা যে বিযুক্ত হয়ে এক হর্ম্যগৃহে দিন কাটান- যেখানে আত্মশ্লাঘা ক্রমশঃ তালহারানো আত্মপ্রচারে মুখ গোঁজে। বিজ্ঞানী যে আবেগে আর পরিশ্রম দিয়ে সূত্রনির্মাণ এবং জীবনকে আরও সুন্দর করার সামগ্রী বানিয়েছিলে- সাধারণ মানুষ তাকে দূর থেকে শ্রদ্ধা করে, সমীহ করে বেশি- নিজের ব’লে মনে করতে চায় না । কারণ সে বুঝে উঠতে পারে না যে এটা তার কল্যাণের জন্যেই।

‘বিজ্ঞানভাষ’ বাংলাভাষায় ভাবতে শেখা, বাংলা ভাষায় কথা বলা চল্লিশ কোটি জনসংখ্যার কাছে পৌঁছতে চায়- বিজ্ঞান ভাবনা নিয়ে। বিজ্ঞান শিক্ষা, বিজ্ঞান মনস্কতা আর বিজ্ঞান অভিক্ষা- শব্দগুলি শুনতে এক হলেও- সরলরেখায় হাঁটে না। এর অন্যতম কারণ নিজের ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা না করা। ছাপানো পত্রিকার চেনা অবয়বের বাইরে অক্ষর নির্ভর বৈদ্যুতিন চরাচর আমাদের সামনে নতুন ক্ষেত্র খুলে দিয়েছে।

আমরা সেখানে থাকতে চাই – মুক্ত প্রমিথিউসের মতো। আপনারা নজর রাখবেন। লিভার ফাউন্ডেশন, পশ্চিমবঙ্গের এই উদ্যোগে রাজ্যসরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তর প্রেরণা ও উত্তাপ জুগিয়েছে।

সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বিজ্ঞান ভাবনার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ হয়ে উঠুক ‘বিজ্ঞানভাষ’- এই কামনা করি।


‘তালিবান’-দের সম্বিত ফিরুক

আফগানিস্থান জ্বলছে, মানুষ কাতরাচ্ছে পথে ঘাটে। আমেরিকার হাতে রাজনৈতিক পরাধীনতার থেকে বেরনোর রাস্তা হিসাবে সায়ত্বশাসনের যে রাস্তা আত্মঘাতী প্রবল যুদ্ধের হাত ধরে সেখানে আসছে, তা সব মিলিয়ে গভীর সামাজিক পরাধীনতার এবং মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসনের ইঙ্গিতবহ বলে বহু মানুষ মনে করছেন। দলে দলে মানুষের দেশ ছাড়ার, হতাহত হবার দৃশ্য সাড়া পৃথিবীর সচেতন বিবেক ও ভাবনাকে নাড়া দিচ্ছে। সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক প্রলয়, জীবনের অসুরক্ষা সব মানুষকেই ভাবায়। আফগানিস্থানের বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানকর্মীরা এই মুহূর্তে অসহায়ের মতো খাঁচায় আটকানো। বিজ্ঞানী না থাকলে বিজ্ঞান ও থাকে না। কাজেই আফগানবিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানকর্মীদের জীবন বাঁচানোই যেখানে সমস্যা সেই পরিবেশে তারা বিজ্ঞানের কাজ কতটা করতে পারবেন তা অবশ্যই প্রশ্ন। কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন বিজ্ঞানীরা জীবন বাঁচাবেন কি ভাবে? নতুন শাসকদের কাছে ‘বিজ্ঞান’ আদৌ সহায়ক বস্তু বলে তাদের অতিপরিচিত আদিম ভাবনায় উঠে আসবে কিনা সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।
যুগে যুগে এমনটা হয়েছে। না, অন্ধকারের মাদকতায় আচ্ছন্ন স্বৈরশাসকদের সামন্ত চিন্তায় বিজ্ঞানের কোন জায়গা থাকে না। আইনস্টাইনকেও জার্মানি ছাড়তে হয়েছিল- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই- ১৯৩৩ সালে। ১৯২২ সালে নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত বিজ্ঞানী হিটলারের একনায়কতন্ত্রী মনোভাব ও মানববিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করার শাস্তি হিসাবে শুনেছিলেন যে তার বিজ্ঞান হচ্ছে ‘ইহুদি বিজ্ঞান’। আইনস্টাইনের ছবি টাঙ্গিয়ে ল্যাম্পপোস্টে নাৎসীরা লিখেছিল ‘এখনও হত্যা করা হয়নি যাকে’। নেহাত জীবন রক্ষার জন্য, বিজ্ঞানের সুর সাধনা চালিয়ে যাবার জন্য আইনস্টাইন ’৩৩ সালে প্রায় নিঃশব্দে জার্মানি ছাড়েন। বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড হয়ে পৌঁছান আমেরিকায়। যুদ্ধ, অস্থিরতা তার মতো সৃষ্টিশীল বিজ্ঞানীর কাজের কতটা ক্ষতি করেছিল হিসেবের স্পর্ধা আমাদের নেই। কিন্তু তার আত্মিক যন্ত্রণা- শরণার্থীর বেদনা আমাদের নতুন করে মনে করাচ্ছে আফগান সঙ্কটের চলমান ছবিগুলো।
তালিবানরা নতুন নয়। অসহিষ্ণু, একদেশদর্শী গোষ্ঠীচিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকা শাসকেরা পৃথিবীতে যখনই যে দেশেই শাসন করেন- তারাই একম্ম করে থাকেন। যুক্তি, তথ্য আর তর্ক করার বিজ্ঞানের মূলউপাদানগুলো এদের কাছে অসহনীয় ঠেকে। আঁধার নামিয়ে এনে সামাজিক নিষ্পেষণ, ভীতি আর সর্বব্যাপী আত্মসমর্পণের বাতাবরণ স্বৈরশাসকেরা তৈরি করেন। বিজ্ঞানের আলো তাদের কাছে বিভীষিকার মতো ঠেকে। তাই চিন্তাশীল আর বিজ্ঞানীদের উপর রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবও এসে পড়ে খুব তাড়াতাড়ি। বিজ্ঞানের কোন বিশ্বাসের ভিত্তি নেই। বিশ্বাসের আগল ভেঙ্গে নতুন চিন্তায় ডুব দেওয়া, অজানা তথ্যকে তুলে আনাই বিজ্ঞানের কাজ। আফগান তালিবানদের হাত থেকে মুক্তি পেতে বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানের কাজে যুক্ত মানুষদের হুড়োহুড়ি এই যুগভাবনাকেই আবার সামনে এনেছে। ঘাড়ের কাছে বন্দুকের নল থাকলে বিজ্ঞানের নিরীক্ষা আদৌ এগোয় না। স্বচ্ছ আকাশ, মুক্ত চিন্তা, প্রশ্ন করার অধিকারকে প্রশ্রয় দিয়েই যে কোন দেশের শাসকদের বিজ্ঞানকে এগোনোর পথ করে দিতে হয়। নচেৎ দেশও এগোয় না। বিজ্ঞানীরা তোতা পাখী হন না। আর আলমারীতে সাজানো বিজ্ঞানের শবদেহ নিয়ে দেশও ডোবে কালের গর্ভে। আশা করব পৃথিবীজোড়া তালিবানদের সম্বিত ফিরবে। যদিও তা কষ্ট কল্পনা।

———————————————————————————————————————————————-

বিজ্ঞান ভাবনা কি স্বাধীন হয়েছে?

ভারতবর্ষ এমন এক দেশ যেখানে বৈচিত্র্যের অভাব নেই। বৈচিত্র্য সংস্কারে, বৈচিত্র্য সংস্কৃতিতে, বৈচিত্র্য ভাষায়। এখনও হাজারো রকমারি কুসংস্কার। এদেশের কোনো অঞ্চলের মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন, মৃন্ময় গনেশ দুগ্ধ সেবন করেন, কোনো অঞ্চলের মানুষ এখনও মনে করেন, সতীদাহ প্রথা জিইয়ে রাখাটা পুণ্যের কাজ, আবার অনেক জায়গার মানুষ মনে করেন – বিষধর সাপে কামড়ালে ঝাড়ফুঁকেই ভিক্টিম বেঁচে ওঠে, নইলে তাকে বৈতরণীতে ভাসিয়ে দিতে হয়।

আমরা সবাই জানি, ইউরোপীয় সভ্যতার হাত ধরেই ভারতের আধুনিকতার আলো পাওয়া। আলো-পাওয়া মানে এনলাইটেনমেন্ট, বিজ্ঞান ও যুক্তিকে সামনে রেখে বেঁচে থাকা ও বাঁচিয়ে রাখা। এখন যাকে আমরা আধুনিক বিজ্ঞান বলি – সেই চর্চাও ইউরোপীয়দের হাত ধরেই এসেছিল এদেশে। আমাদের দেশেরও নিজস্ব চর্চার জায়গা ছিল বটে কিন্তু তা “আধুনিক” ছিল না। তারাশঙ্করের আরোগ্য নিকেতন মনে করুন। সে-গল্প সনাতন কবিরাজি প্রথা বনাম আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বোঝাপড়ার। ভারতে যে সমস্ত প্রাচীন চর্চা ছিল, সেগুলোর প্রায় কোনোটাই আধুনিক বিজ্ঞানে স্থান পায় নি। এমনকি ব্যাকরণ চর্চার ক্ষেত্রেও যে ঐতিহ্যের দেশ এই ভারত, সে ঐতিহ্য আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের থেকে আলাদা। অনেক বিষয়ে ভেতরে ভেতরে মিল থাকা সত্ত্বেও। অর্থাৎ, ভারতীয় চর্চার চরিত্র আধুনিক চর্চার চরিত্রের থেকে আলাদা ছিল। দৃষ্টান্ত দিলেই জিনিসটা বোঝা সহজ হবে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে অনুমান প্রমাণ নয়, কিন্তু ভারতীয় ন্যায়শাস্ত্রে তো বটেই, আয়ুর্বেদশাস্ত্রেও অনুমানের গুরুত্ব ছিল সাংঘাতিক।

কিন্তু আজকের প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। যেভাবেই হোক, ভারতীয় চিন্তায় আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়া তো লেগেইছিল সেই উপনিবেশের আমলে। ভারতে অনেক পণ্ডিত মানুষ আধুনিক বিজ্ঞানচর্চায় অংশগ্রহণও করেছেন। কিন্তু আজ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতার ৭৬ বছরের মাথায় এসে আমাদের মনে সংশয় জাগে, আমরা কি সত্যিই বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিশেষ অবদান রাখতে পেরেছি; ভারতীয় সমাজে সরাসরি যার ফলশ্রুতি ঘটতে পারে!

বিজ্ঞানের সরাসরি চর্চা করা আর বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যে কিন্তু ফারাক আছে। যেমন ফারাক আছে গণিত জানা আর গাণিতিক মন তৈরি করার মধ্যে। একজন শিল্পী, চিত্র শিল্পীর কথাই ধরা যাক। তিনি যখন কোনো ছবি আঁকেন, তখন তাঁর প্রতিটা আখরে-টানে গণিতের সূত্র নিহিত থাকে, কিন্তু তাই বলে তাঁকে গণিতের সমীকরণ জানতে হয় না। আমাদের বিজ্ঞানভাষ যখন ত্রৈমাসিক বেরোতো, তখনও যেমন, বিজ্ঞানের প্রসার সকল মানুষের মধ্যে হোক – এই চেতনা আমাদের কর্মীদের মধ্যে কাজ করত, এখনও দৈনিক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশের শুরু থেকেই – তেমন চেতনাই জাগরুক রয়েছে।

ভারতবর্ষে বিজ্ঞানের অগ্রগতি বলতে যা বোঝায় – তা মূলত তিনভাবে কাজ করে এসেছে শুরু থেকে। এক, জ্ঞানতাত্ত্বিক বিজ্ঞানচর্চা, দুই হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে উন্নত করা আর তিন, কুসংস্কার বা কুপ্রথা নিবারণে সমাজকে সচেতন করে তোলা। তৃতীয় কাজটাই ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা ঘটিয়েছে বললে অত্যুক্তি করা হয় না। রামমোহনের সতীদাহ, বিদ্যাসাগরের বাল্যবিবাহ রোধ, ইত্যাদি আইন প্রণয়ন – সেই কাজের কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়। অথচ, আজও সেই কাজ জ্ঞানচর্চার মহলে বা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে খুব একটা মর্যাদা পায় না। কেন?

জওহরলাল নেহরু রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র তৈরি বা নদীতে বাঁধ দেবার কথা যেভাবে উপলব্ধি করেছিলেন – সেভাবে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার অগ্রগতির ঘটেছে বলে ধরা হয়। নেহরুর উদ্যোগে বৈজ্ঞানিক গবেষণার উদ্দেশ্যে প্রায় ৫০টি জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় স্বাধীনতার পরেই। এই উদ্যোগকে আমরা গর্বের সঙ্গেই মনে রাখছি। কিংবা মনে রাখছি সত্যেন্দ্রনাথ বসু বা জগদীশচন্দ্র বসুর মতো মানুষের বৈজ্ঞানিক কাজের অবদানকে অথবা রামানুজনের মতো গাণিতিক প্রতিভাকেও। সেইসঙ্গে মনে রাখব, কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সি সুভ্রমনিয়মের কথাও, যাঁর কৃতিত্বে, এক ধাক্কায় ১৯৬২ সালে, কৃষিজাত খাদ্য-উৎপাদন ৩৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানবোধ, যুক্তিনিষ্ঠতা কতটা গড়ে উঠল এই ৭৬ বছরে – সে-কথাও মনে হয় হিসেবের মধ্যে রাখা দরকার। না-হলে রামানুজনের মতো শ্রেষ্ঠ প্রতিভারও ম্লেচ্ছ খাবার না-খাওয়ার ফল হিসেবে বিজ্ঞানের এন্তেকাল ঘটবে – যা খুবএকটা সুখের নয় বলেই মনে হয়। কী বলেন?


বিজ্ঞানভাষ দৈনিক- এক দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা

বিজ্ঞানভাষ দৈনিক হিসেবে আসছে। মাধ্যম আন্তর্জালিক। মূল লক্ষ্য, বিজ্ঞানের খবর সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিজ্ঞান-বিষয়ক খবর বাঙালি পাঠকের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা। বিজ্ঞান দৈনিক, কথাটা শুনলে চমকে উঠতে হয় বৈকি! তবে আমরা চমক সৃষ্টি করতে চাই না। কিছুটা খ্যাপামি আছে, বিশু পাগলই তো শুধু রক্ত করবীর খোঁজ রাখে। স্পর্ধা নিশ্চয়ই আছে। পৃথিবীর গতি, সে-পৃথিবীর সঙ্গে জীবজগতের সম্পর্ক, এ-সব নিয়ে প্রতিদিন সংবাদ পরিবেশন করা, কঠিন। কিন্তু পৃথিবীর গতির সঙ্গে মানুষের তাল মিলিয়ে চলার গোটা প্রক্রিয়াটাইতো দুঃসাহস। ‘বিজ্ঞানভাষ’ সেই দুঃসাহসের অংশীদার। তারই প্রেরণা থেকে শুরু হল দৈনিক বিজ্ঞানভাষ-এর পথ চলা।

ভাবনাটা পুরনোই। বাংলা ভাষার ছন্দ আর নান্দনিক অন্তরের সঙ্গে বিজ্ঞানের শক্তি, সৌন্দর্য আর স্পর্ধার সম্মিলন। স্বপ্ন দেখা- পাতা নড়া জল পড়ার মতো বিজ্ঞানের প্রতিটা শব্দ প্রতি অনুক্ষণে যেন পৌঁছে যায় বাংলা ভাষায় কথা বলা প্রত্যেকের কাছে। যেভাবে আমরা খেলার জগতের পান থেকে চুন খসার খবর নিয়ে মেতে উঠি, রাজনীতি বা বিনোদনের নেশায় ডুবে যাই, সেভাবে তো আমরা বিজ্ঞানের ধরা-অধরা জগতে পা ফেলতে চাই না। সে জগৎ আমাদের কাছে সুদূরের গ্রহ, ওটা যেন বিজ্ঞানী নামের অতিপ্রাকৃতিক, অধিভৌতিক অস্তিত্বের অধিকারীদের একমাত্র হকের জিনিস। আমা-জনতার আলোচনায় বিজ্ঞানের কল্পনা যেন বড় কঠিন, কর্কশ, দাঁতভাঙা। ‘অতসত বুঝিনা বাবু’ তেই তার পথচলা শেষ হয়। যদিওবা কেউ চেষ্টা করেন বিজ্ঞানের দুরূহ তত্ব বা তথ্যকে সোজা-সাপটা ভাবে পৌঁছে দিতে- তখন আবার ভ্রুকুটি ছুটে আসে সনাতন ধর্মচারীদের থেকে। ‘জোলো’ হয়ে যাচ্ছে বলে অপাংতেয় মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। বিজ্ঞান যে পৃথিবীর সতত বয়ে চলা সহজ, সরল অস্তিত্বের চর্চা- তা মেনে নিতে মন চায়না কিছুতেই। সংস্কৃতি আর অভ্যাস আমাদের বড় বালাই। দাঁতফাটা শব্দে শোভিত হয়ে টাই পড়া সাহেবরা যতক্ষণ মাথায় মুগুর মেরে বিজ্ঞানের কথা আমাদের বলেছেন ততক্ষণ মনে হয় না ব্যাপারটা জমলো। স্কুলে বিজ্ঞান পড়ার ব্যাপারটা তো এখনও পুরোপুরি ভূতের বাড়ীর প্রবেশাধিকার গোছের করে রাখা আছে। ফাটাফাটি নম্বর পেয়ে খোলসা মাথা ঠিক করার মানদণ্ডে যারা উত্তীর্ণ হতে পারেন- তারাই শুধু সাহস করে বিজ্ঞান পড়েন। ‘তোর মাথা নেই, বিজ্ঞান টানতে পারবিনা’- শুনতে শুনতেই অনেক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওবাড়ীর দরজায় কড়া নাড়ার সাহস পাননা। এর পরের গপ্পোটা আরও পরিচিত। শুধু সোপান বেয়ে এগিয়ে চলা। কারো বা আছড়ে পড়া, মাথা ফাটা।  ডিগ্রীর ঝনঝনানি আর অভিজাত্যের কার্পেটে পথ চলতে চলতে বিজ্ঞানের ঢেকুর তোলা চলতেই থাকে। হীরক রাজার সভার মতো অনেকটাই। রাজসভা-বিদ্যৎসভায় যখন আলোর রোশনাইতে ঝলকে ওঠে বিজ্ঞানের পরীকশায় পাওয়া নম্বর তখন সমাজ জুড়ে চলতে থাকে বুজরুকী, সংস্কার আর লীলা খেলার চর্চা। হবে নাই বা কেন? আমরা তো মানুষের জীবন ও বিজ্ঞানের অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্বের কথা বলিইনি কখনও। বিজ্ঞান হয়ে আছে সমীহ আর সম্ভ্রমের বস্তু। বিজ্ঞান পড়ার অধিকারটাও ঠিক ওরকম পরিখা দিয়ে ঘেরা। মাথা যথেষ্ট ভালো না হলে সে নাকি বিজ্ঞান বুঝবে না। অতএব ও পথে তার যাতায়াতের ক্ষমতা নেই! ভালবাসা নয়, মেধার অদ্ভুত মাপকাঠিতে ভালো সাফল্য না আসলে বিজ্ঞান পড়া যাবে না। এটাই দস্তুর। উল্টোদিকে মেধার আগুনে জ্বলতে জ্বলতে যারা বিজ্ঞানের রথে চেপে বসতে পারে, নিজেদের সর্বোত্তম ও সফলতম মানুষ ভাবার গর্বে তাদের পা আর মাটিতে নামতেই চায় না। বিশ্বাস পথ আটকায় যুক্তির, তর্কের, নতুন ভাবনার।

দেশ বিরাট, বিচিত্র তার লোক-সংগঠন, ভাষা, আচার-বিচার। এমন এক লোকসমষ্টির মধ্যে বিজ্ঞানের চর্চা করতে হলে “কুলীন” অহংকারটাকে বিসর্জন দিতে হবে। বিজ্ঞানকে নিত্যদিনের সঙ্গী করতে হবে, লোকের সঙ্গে লোকের কথায়-বার্তায় বিজ্ঞানকে নিয়ে আসতে হবে, তাতে লোকেরও সমৃদ্ধি, বিজ্ঞানেরও।  ময়ূরাক্ষী, দামোদর, অজয়, গঙ্গা, তিস্তা, তুঙ্গভদ্রা ঘেরা এ বঙ্গে একাজের একমাত্র বাহন হতে পারে বাংলা।

মজার ব্যাপার হল- বিজ্ঞান বিজ্ঞান খেলা গ্রামে হয়না, শহরেও না। অথচ টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখতে দেখতে বাংলার গাঁ-এর মাঠগুলোতেও এখন বছর জুড়ে ফুটবল সরিয়ে ক্রিকেট খেলা চলছে। দৃশ্যশ্রাব্য ও সমাজ মাধ্যমে ভাল করে ‘খাওয়াতে’ পারলে মানুষের ভাবনা ও ব্যবহারকে যে প্রভাবিত করা যায়- করোনা পরিস্থিতি সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল। যত ভয়, শঙ্কা, ভুল তথ্যের ঢেউ সামলে আমরা এখনও করোনাকে নিয়ে ঘর করছি এবং করোনাকে কেন্দ্র করে নানা খবরের চর্চা করছি তার অনেকটাই এই সূত্রগুলোতেই পাওয়া। আসলে ভয়ের খবর অসহায়ত্বের আবরণে ঢাকা পৃথিবীতে ছড়ায় বিদ্যুতের থেকেও তাড়াতাড়ি। অজানা, অচেনা, হানিকর বিষয়কে জানার জন্য আগ্রহের মাটি তৈরীই থাকে। আমাদের চেষ্টা করতে হবে সেই আগ্রহের শিখাটাকে প্রজ্জ্বলিত রাখার, শুদ্ধ রাখার। দু’দণ্ড মানুষের পাশে বসে, তার কথা শুনে যদি পথ ঠিক করি, তাহলে পথ নিজেই এসে আমাদের সামনে হাজির হবে।   বিজ্ঞান পড়ার আগ্রহ তৈরি করতে গেলে আগে দরকার বিজ্ঞান শোনা ও বিজ্ঞান বলা, বিজ্ঞান নিয়ে কথোপকথন। বিজ্ঞানভাষ যদি এটা করতে চায়। সে শুনতে চায়, এবং সেই শোনা থেকে পাওয়া পথ ধরে  বিজ্ঞানের কথোপকথন চালিয়ে যেতে যায়।  বিজ্ঞানের ভাষা, আমাদের মানতেই হবে, মুখের ভাষা থেকে আলাদা। কিন্তু, এটাও মানতে হিওবে যে, মুখের ভাষা থেকে রসদ না নিয়ে বিজ্ঞানের ভাষা তৈরি হয় না। বিজ্ঞানভাষ এই দূরত্বটা ঘুচিয়ে বিজ্ঞানের ভাষাকে এমনভাবে সমৃদ্ধ করে তুলতে চায়, যাতে তথাকথিত সাধারণ মানুষের কাছে তার আসা-যাওয়াটা হয়ে ওঠে সহজ আত্মীয়তার মতো।  প্রতিটা মানুষ ভাবতে শুরু করবে, বিজ্ঞান আমারও। ভূতপূজো বন্ধ হয়ে বিজ্ঞানের কেন্দ্র হবে গ্রামে, শহরের বহুতলে, পাড়ায়, বস্তিতে।

সব স্পর্ধা, সব ঐতিহ্য, ইতিহাসের শিক্ষা বুকে নিয়ে বিজ্ঞানভাষ দৈনিক হচ্ছে। সঙ্গে আছে বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য। বিজ্ঞানের বিশ্বে লোকসমাজের পদার্পণ ঘটবে, বিজ্ঞান নিজেকে লোকবিশ্বে উপস্থিত করবে, এই আশাই বিজ্ঞানভাষ দৈনিকের দুঃসাহস। সম্বলও বটে।


উপদেষ্টামণ্ডলী
বিকাশ সিংহ, পার্থপ্রতিম মজুমদার, সমর বাগচী

প্রধান সম্পাদক
অভিজিৎ চৌধুরী

সম্পাদক
দেবদূত ঘোষঠাকুর

সহ সম্পাদক
অর্পণ পাল

সম্পাদকমন্ডলী
পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়, শিবাংশু মুখোপাধ্যায়, উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়, বিষাণ বসু, সন্দীপ চৌবে, স্বপন চক্রবর্তী এবং ডাঃ স্থবির দাশগুপ্ত

সম্পাদকীয় বিভাগ
অরিন্দম ব্যানার্জী, অর্চিস্মান কুন্ডু, সুদীপ পাকড়াশি এবং অর্পণ নস্কর

সম্পাদনা সহায়তা
গোপাল পালিত

কারিগরি সম্পাদনা
ডি-টেক সিস্টেম ও অ্যারানাক্স টেকনলজি

লিভার ফাউন্ডেশন, পশ্চিমবঙ্গ-এর একটি উদ্যোগ