কাউন্ট ড্রাকুলা ও হাইড্রোফোবিয়া

কাউন্ট ড্রাকুলা ও হাইড্রোফোবিয়া

ঘরের কড়িকাঠে সে ঝুলায়মান। তার পা দুটো উপরে আর মাথাটা নিচে। একটা না পাখি, না পশু এই জীব। ঘরের বাসিন্দা তাকে খুব একটা পাত্তা দেয় না। কিন্তু গভীর রাতে গৃহকর্তা ঘুমিয়ে পড়লেই প্রাণীটি কড়িকাঠ থেকে উড়ে নিচে নেমে আসে। ভোজবাজির মত সেটি একটি কালো পোষাক পরা পূর্ণবয়স্ক মানুষে রূপান্তরিত হয়। তারপর ধীরে ধীরে ঘুমন্ত গৃহকর্তাকে একবার দেখে নিয়ে সে তার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখ আনে। নিজের শ্বদন্ত উন্মোচন করে শিকারের ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে নিঃসাড়ে তার রক্তপান করে। শিকারের অজান্তে, তাকে তিলে তিলে এইভাবে নিঃশেষ করে অবশেষে প্রাণীটি তাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়।

প্রাণীটি যে ‘ভ্যাম্পায়ার’ এবং তার পূর্ণাঙ্গ রূপটি যে কাউন্ট ড্রাকুলা, সেটা ব্রাম স্টোকারের গল্প না পড়ে থাকলেও নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন। বলেছিলাম না, হ্যালোউইন থেকে ভূত-চতুর্দশী অবধি বিজ্ঞানভাষে অদ্ভূতুড়ে আলোচনা করব। তাই এই নতুন কিস্তিতে খোদ ড্রাকুলাকেই নিয়ে এলাম।

‘মিথ’-এর পিছনে ধাওয়া করতে করতে ট্রান্সিল্ভেনিয়া থেকে লাতিন আমেরিকা চলে যেতে হল। আসলে ‘ভ্যাম্পায়ার’ বাদুড় তো সত্যিই আছে! তবে অভয় দিচ্ছি, ‘ভ্যাম্পায়ার’-এর কামড়ে ড্রাকুলা বনবেন না। তাই রসুনের গন্ধে প্রাণও ওষ্ঠাগত হবে না আর সূর্যের আলোয় পুড়েও যাবেন না। কিন্তু ভয়ের হেতু অন্য।

দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় বাস এই ‘ভ্যাম্পায়ার’ বাদুড়ের। রক্তই হল এর পুষ্টির ভাণ্ডার। এরা শিকার করে রাতের বেলা – একদম গল্পের মত। হতভাগ্যদের দলে মূলতঃ ঘোড়া এবং গবাদি পশু। তবে পাকেচক্রে মানুষও বাদ যায় না।

এদের শিকার করার পদ্ধতিটি অনবদ্য। নাকে অবস্থিত তাপ-নির্ধারক ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে পশুর গরম রক্তের সন্ধান পেয়ে, নিঃশব্দে উড়ে এসে তার গায়ে বসে। প্রথমেই ধারালো দাঁতদুটি কাঁচির মত ব্যবহার করে পশুটির সেই জায়গার লোম ছেঁটে ফেলে। এতে ত্বকের নাগাল পাওয়া সহজ হয়। এরপর সেখানে তীক্ষ্ণ দাঁত বসিয়ে ফুটো করতেই রক্তধারা বেরিয়ে আসে। বাদুড়বাবাজি সেটাই জিভ দিয়ে চেটে খেতে থাকে। রক্ত যাতে জমাট না বাঁধে তার বন্দোবস্তও আছে লালাতে।

এতে ভয়ের কী আছে!

না, ভয়ের ব্যাপারটা এবার শুরু হবে। ‘ভ্যাম্পায়ার’ বাদুড় কিছু ক্ষেত্রে ‘রেবিস’ (rabies) ভাইরাস বহন করে। নামটা চেনা চেনা লাগছে, তাই না? এতো পাগল কুকুর কামড়ালে ছড়ায় জানতেন। ঠিক তাই। কুকুর যে ‘পাগল’ হয় তার কারণও এই ‘রেবিস’। এই ভাইরাস ছড়ায় স্নায়ুর মাধ্যমে – যাকে ‘নিউরোট্রপিক’ (neurotropic) বলা হয়। স্নায়ুর মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ভাইরাস একসময় মস্তিষ্কে পৌঁছয়। প্রসঙ্গত বলি, ক্ষতস্থান থেকে মস্তিষ্কের দূরত্ব আর ভাইরাসের প্রভাব বিস্তারের সময়কাল সমানুপাতিক। তাই পায়ে ক্ষত হলে অসুস্থ হতে যতদিন লাগবে, হাতে হলে সেটাই হয়ত অর্ধেক দিনে হবে। ‘রেবিস’ ভাইরাস মস্তিষ্কে পৌঁছে মারাত্মক হয়ে ওঠে। আক্রান্ত মস্তিষ্ক আয়তনে বাড়তে থাকে। ফলে, অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পায় এবং অসুস্থ প্রাণীটি বদমেজাজি, খিটখিটে হয়ে ওঠে। ঠিক ‘পাগল’ কুকুর যে ধরণের স্বভাব ব্যক্ত করে।

আস্তে আস্তে প্রাণীটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকে। কিন্তু সে মারা গেলে তো ভাইরাসেরও দফারফা। অতিথি ভাইরাস যখন বোঝে যে ‘হোটেল’ বন্ধ হতে চলেছে, তখন সে বুদ্ধি খাটিয়ে ‘চেক আউট’ করা স্থির করে। এই সময় সে প্রাণীটির লালাগ্রন্থিকে কব্জা করে। ফলে তার মুখে যে লালা তৈরী হয়, তাতেই ভাইরাস ঠাঁই পায়। আক্রান্ত কুকুরকে খেয়াল করলে দেখবেন, তার মুখের দু’পাশ থেকে সফেন, সাদা লালা ঝরছে। অর্থাৎ ভাইরাসটি সতেজে বাইরে বেরিয়ে নতুন আস্তানা খুঁজতে বদ্ধপরিকর। ঠিক এই কারণে ‘পাগল’ কুকুর কামড়ায়। বেচারার এতে কোন দোষই নেই। যাকে কামড়ায়, তার মধ্যে ‘রেবিস’ প্রবেশ করে।

পরবর্তী ‘হোস্ট’ মানুষ হলে, তার শরীরেও ‘রেবিস’ একইভাবে নিজের কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করে। ভাইরাসের কলকাঠি নাড়ার ফলেই ‘হাইড্রোফোবিয়া’ (hydrophobia) বা জলাতঙ্ক হয়। ‘হোস্ট’-এর জীবনের অন্তিমকালে ভাইরাস তার মুখে ঘাঁটি গেড়ে বাইরে বেরোতে চায় – বলেছি আগেই। কিন্তু জল বা কোন পানীয় মুখে গেলে ভাইরাসটি তাতে দ্রবীভূত হয়ে নিজের শক্তি হারাবে। এই কারণেই জলাতঙ্ক দেখা দেয়। মনে করতে পারেন, ভাইরাসটিই নিজের স্বার্থে রোগীকে জল খেতে বাধা দেয়।

তবে সুখের কথা, মানুষ আক্রান্ত হলে সে সচরাচর অপর মানুষকে কামড়ায় না। কিন্তু গল্পে সেটাই একটু আলাদা হয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি বাদুড়ের আকার ধারণ করে অন্য ব্যক্তির রক্তপান করলে, অন্যের মধ্যেও সে নিজের জীবাণু ছড়িয়ে দেয় এবং তাকেও আরেকটি বাদুড়ে পরিণত করে। ঘাড়ের ক্ষতস্থান থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছতে ভাইরাসটির আর কত দিনই বা লাগতে পারে!

‘মিথ’-টাকে এভাবে বৈজ্ঞানিক কায়দায় ভাবতে বেশ লাগছে, না?

ছবি সৌজন্যঃ এভরিওয়ান ব্লগ