মগজধোলাই

মগজধোলাই

অক্টোবরের শেষভাগে এসে পড়েছি। কদিন বাদেই হ্যালোউইন। তারও কিছুদিন বাদে ভূত-চতুর্দশী। তাই নিজের ইচ্ছেতেই ভাবছি বিজ্ঞানভাষের কিস্তিগুলোতে কিছু অদ্ভূতুড়ে কথা লিখলে কেমন হয়!

এই রে, বিজ্ঞানভাষে ভূত-তত্ত্ব! এ তো সর্ষের মধ্যে ভূত! সম্পাদকমশাই তেড়ে এলেন বলে।

তাই একটা মোক্ষম উপায় বের করেছি। তাতে ঘরেরও খাওয়া হবে,আবার বনের মোষও তাড়ানো যাবে।

‘জম্বি’ (বা শ্রদ্ধেয় পরশুরামের কায়দায় ‘Zম্বি’) জানেন নিশ্চয়ই? সেই যে, মরেও না মরা পিশাচ, যারা কিনা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে আর আক্ষরিকভাবে অন্যের মাথা চিবিয়ে খায়! (না জানলে, ব্র্যাড পিট অভিনীত ‘World War Z’ দ্রষ্টব্য।)

আচ্ছা, যদি বলি ‘জম্বি’ সত্যি সত্যিই আছে? বিশ্বাস হবে না, তাই না?

তাহলে চলুন, আপনাকে নিয়ে যাই আমাজন রেইনফরেস্টে। আজকের লেখাটা পড়তে থাকুন আর কল্পনার রাশ আলগা করে নিজের মনে ছবিটা সাজিয়ে নিন।

আমরা এখন রেইনফরেস্টে হাঁটছি। গহন এলাকা। সকালবেলা বলে, বিশাল বিশাল উঁচু গাছের পাতার ছাউনির ভিতর দিয়ে সূর্য লুকোচুরি খেলছে। আলো এই আছে, এই নেই। হঠাৎ টুপ করে একটা লাল পিঁপড়ে উপর থেকে খসে পড়ল আমার কাঁধে। আপনি সেটা ঝেড়ে ফেলে দিতে গিয়ে থমকে গেলেন। আমাকে ডাকলেন। আমরা দুজনে এক অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম। পিঁপড়েটা কেমন যেন দিশেহারা – সবকিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেছে তার। কোথায় যাচ্ছে, কি করছে – কিছুই যেন সে জানে না। একটু পরে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আমার কাঁধ বেয়ে সেটা নামতে লাগল। আমি তাকে ঝেড়ে ফেললাম।

‘কার্পেন্টার অ্যান্ট’ (carpenter ant)!

আমার মন ততক্ষণে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। যা খুঁজছি, তা হয়ত কাছেই আছে। আপনাকে বললাম, ২৫ সেন্টিমিটার হাইটে গাছের পাতাগুলোর দিকে চোখ রেখে চলতে। আপনাকে একটা নতুন জিনিস দেখাব। এই মুহূর্তে প্রকৃতির শোভা অগ্রাহ্য করে আমরা এগিয়ে চলেছি এক অন্য লক্ষে।

হঠাৎ চোখে পড়ল। ঠিক যা চাইছিলাম। সামনের গাছের পাতা থেকে একটা পিঁপড়ে ঝুলছে। আমি আপনাকে ডেকে নিয়ে দৌড়ে সেখানে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখি সেটা মৃত। অবশ্য সেটাকে কি পিঁপড়ে বলব? না, এটা কেবল তার খোলস। আর তার মাথার পিছন থেকে বাদামি রঙের একটা সরু উদ্ভিদ বেরিয়েছে। সেটার মাথায় একটা গোল ফুলের মত কিছু। আমাদের থেকে অল্প দূরে এক সারি পিঁপড়ে চলেছে খাদ্যান্বেষণে। তারা জানে না, কি বিপদ তাদের জন্য ওঁত পেতে রয়েছে। নাঃ, এখানে আর থাকা চলে না।

মানস-ভ্রমণ শেষ।

এবার তাহলে পুরো ব্যাপারটা খুলেই বলি। ওই যে উদ্ভিদ – ওর ডাকনাম ‘কর্ডিসেপ্স’ (Ophiocordyceps unilateralis)। একধরণের ছত্রাক। তবে সাধারণ ছত্রাকের থেকে আলাদা। এ পরজীবি। ছত্রাক ছড়ায় ‘স্পোর-এর (spore) মাধ্যমে। যেটা ওই ফুলের মত অংশটার মধ্যে থাকে। সেটা ফাটলে ‘স্পোর’ ‘ল্যাণ্ডমাইন’-এর মত জঙ্গলের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। পিঁপড়েরা কখনো মাটির উপর দিয়ে যাতায়াত করতে গেলে ওই ‘স্পোর’ তাদের গায়ে লেগে যায় এবং তার শরীরে প্রবেশ করে।
ওই একটা কোষ বিভাজিত হয়ে অনেক হয়। সেগুলি পরস্পরের মধ্যে একটা জাল বিছিয়ে সংযোগ স্থাপন করে এবং পিঁপড়ের দেহের পুষ্টি আত্মসাৎ করে। কিন্তু, এতেই শেষ নয়। মনে করা হয়, ‘কর্ডিসেপ্স’-এর ‘স্পোর’গুলো মারাত্মক এক রাসায়নিক বিস্তার করে ওই পিঁপড়েকে কব্জা করে ফেলে।

যেকোনো মস্তিষ্কযুক্ত জীবের পেশী-সঞ্চালন সম্ভব হয় মস্তিষ্ক থেকে নির্গত স্নায়ুকোষ বা ‘নিউরন’-এর (neuron) সাহায্যে। কিন্তু ওই রাসায়নিক পিঁপড়ের সমগ্র স্নায়বিক সেতুটিকে ধ্বংস করে দেয় এবং সেই খালি সিংহাসনে নিজেকে অভিষিক্ত করে। কেবল তার মস্তিষ্কে ‘করডিসেপ্স’ হাত লাগায় না। বেচারা পিঁপড়েটি নিজের অজান্তে ধীরে ধীরে অন্যের শাসনাধীন হয়ে পড়ে – ঠিক একটা ‘জম্বি’-র মতই। তার নিজস্বতা কিছুই থাকে না। কখনো কখনো বেসামাল হয়ে গাছ থেকে টুপ করে খসে পড়ে।

জীবনের শেষ লগ্নে, সে একটা গাছের ২৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় উঠে, তার পাতার মধ্যশিরায় একটা মরণকামড় দিয়ে সেখানেই রয়ে যায়। কামড়টাও অবশ্য ‘কর্ডিসেপ্স’-এরই কাজ। আসলে সংক্রমিত পিঁপড়ের চোয়ালের পেশী অতিসঙ্কুচিত হয়ে (hypercontraction) প্রচণ্ড শক্তিতে বন্ধ হয়। তার ফলেই ওই অনিচ্ছাকৃত, স্বয়ংক্রিয় কামড়।

পিঁপড়েটি শোষিত হতে হতে সেখানেই মারা যায়। সঠিক উচ্চতায় থাকার ফলে পরিমাণ মত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা পেয়ে পিঁপড়েটির মাথার ভিতর থেকে জন্ম নেয় আরেকটি নতুন ছত্রাক। এবারে সে যে জায়গায় গজিয়েছে, সেখান থেকে দশ বর্গফুটের মধ্যে যেকোনো পিঁপড়ের নাগাল পাওয়া সম্ভব। ‘কর্ডিসেপ্স’ বা ‘জম্বি ফাঙ্গাস’ আবার তার ‘স্পোর’ ছড়িয়ে দেবে এবং এবার ‘জম্বি’ পিঁপড়ে তৈরী হবে আগের থেকেও বেশি।

ছবি সৌজন্যঃ মিডিয়াম