মঙ্গলকাব্য

মঙ্গলকাব্য

আমার সামনে সু-উচ্চ জলস্তম্ভ। এ মুহূর্তে পালানোই শ্রেয়। কিন্তু এ দৃশ্যের চৌম্বকীয় আকর্ষণ এতটাই যে মৃত্যু অনিবার্য জেনেও পিছু হঠতে পারছি না।

এই দিন আসতই। এ কেবল কিছু দিনের অপেক্ষা ছিল মাত্র। কিন্তু আজ এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, একবার যদি কোনো যাদুবলে সবকিছু পালটে ফেলা যেত! যদি মেরুর বরফ গলতে না দিতাম! যদি নির্বিচারে শেষ গাছের শিকড়টাও উপড়ে না ফেলতাম! যদি…

না থাক। এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-আমাদেরই কৃতকর্মের ফল। তাকে ভোগ তো করতেই হবে। পৃথিবীর বিকল্প কোনো স্থান থাকলে হয়তো আরেকবার নোয়ার নৌকো তৈরি করা যেত। কিন্তু কোথায়ই বা যাব!

উন্মত্ত জলরাশি মাথার উপর ফণা তুলেছে। এবার কাউন্টডাউন। আমি চোখ বন্ধ করি। পতনশীল জলের গর্জন কানে আসছে।

ক্রিংং…

আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কী দুঃস্বপ্ন! অ্যালার্ম না বাজলে যে কী হত। রাতের বেলা ‘অ্যাপোক্যালিপ্টিক মুভি’ দেখার ফসল!

কিন্তু মন থেকে খচখচানি গেল না। এ স্বপ্ন তো ঘোর অলীক নয়। আমার জীবদ্দশায় না হোক, অদূর ভবিষ্যতে তো এরকম কিছু হতেই পারে।

পৃথিবীর বুকে অকথ্য অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে প্রকৃতি রুখে দাঁড়িয়েছে। এদিকে পৃথিবীর জনসংখ্যা দ্রুতহারে বর্ধমান। এই মুহূর্তে পৃথিবীর বিকল্প যেন খুব দরকার হয়ে পড়েছে। কিন্তু তা কি আছে?

চাঁদ? না চাঁদের আয়তন কী আর এমন! তাহলে?

সৌরমণ্ডলে পৃথিবীর একমাত্র বিকল্প হতে পারে প্রতিবেশী লোহিত-গ্রহ, মঙ্গল। আয়তনে ছোট হলেও, মঙ্গল আর পৃথিবীর বাসযোগ্য surface area প্রায় সমান। কারণ পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশই জল। মঙ্গলের দিন আমাদের দিনের থেকে ছত্রিশ মিনিট মত বেশি। সেদিক দিয়েও অসুবিধা নেই। কিন্তু তাই বলে যাওয়া কী মুখের কথা!

১) মঙ্গলের বায়ুস্তর খুবই পাতলা। পৃথিবীর একশ ভাগের এক ভাগ। ফলে সূর্যসহ অন্যান্য মহাজাগতিক বিকিরণ (solar radiation/cosmic radiation) যে মাত্রায় হবে তাতে জীবনযাত্রা অসম্ভব।

২) অক্সিজেন ছাড়া যেখানে টেকাই দায়, সেখানে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ প্রায় ৯৬%।

৩) মঙ্গলের গড় তাপমাত্রা -৮১ ডিগ্রী ফারেনহাইট। বায়ুমণ্ডল দুর্বল হওয়ার কারণে গ্রীষ্মের কোনো এক সকালে তাপমাত্রা হয়ত ৭০ ডিগ্রীতে উঠে গেল আর রাতের বেলা -১০০ ডিগ্রীতে নেমে এল।

৪) এখানে বছরভর ধুলোর ঝড় লেগেই থাকে। তা একবার এলে কয়েক সপ্তাহ অবধিও টানা চলতে পারে যার ফলে সূর্যালোক অদৃশ্য হবে।

৫) মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ। এর ফলে শরীরের হাড় ও পেশী দুর্বল হওয়ার প্রবণতা খুবই বেশি।

৬) পৃথিবী থেকে চাঁদে পৌঁছতে লাগে দিনতিনেক। সেখানে মঙ্গলে যেতে গেলে লাগবে প্রায় আট মাস। তাও আবার গ্রহগুলি স্ব-স্ব কক্ষপথে ঘোরার ফলে, পৃথিবী থেকে মঙ্গলের দূরত্ব সদা পরিবর্তনশীল। তাই এই আট মাসের হিসেব ন্যূনতম – দু’বছরে মোটে একবার এই সু্যোগ আসে।

কিন্তু মানুষের অসাধ্য বলে যে কিছু নেই তা তো নেপোলিয়নই বলে গেছেন!

মানুষকে লাল মাটির দেশে পাঠাতে গেলে চেকলিস্টে পাঁচটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ।

১) জলঃ মজার ব্যাপার, মঙ্গলে বহুপূর্বে জল ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা জমাট বেঁধে মাটির তলায় অবস্থিত। গ্রহের মেরু অঞ্চলেই যা জলের খনি আছে, তা গলাতে পারলেই কেল্লা ফতে! তাছাড়া dehumidifier ব্যবহার করেও মঙ্গলের আর্দ্রতাকে জলে পরিণত করা যেতে পারে।

২) অক্সিজেনঃ Moxie! এ হল M.I.T-এর এক যন্ত্র (রিভার্স-ফুয়েল-সেল), যা দিয়ে বাতাসের কার্বন ডাইঅক্সাইড থেকে অক্সিজেন নিষ্কাশন করা যায়।

৩) খাদ্যঃ ‘হাইড্রোপোনিক্স’ হল কৃষিবিজ্ঞানের এক অভিনব আবিষ্কার। এতে মাটির অনুপস্থিতিতে, জলই উদ্ভিদের পালকপিতা। মঙ্গলের অনুর্বর মাটির তোয়াক্কা না করে স্রেফ জল দিয়েই কৃষিকাজ করা যাবে।

৪) বস্ত্রঃ মঙ্গলগ্রহে বায়ুচাপ খুবই কম হওয়ার দরুণ শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ ব্যাহত হবে। সেই কারণে এমন পোষাক প্রয়োজন যা মানবদেহে চাপ বজায় রাখে এবং শরীরকে গরম রাখে।

৫) বাসস্থানঃ শেষ অপরিহার্য জিনিস হল মাথার উপর ছাদ। মঙ্গলে বাঁচার জন্য চাই উচ্চচাপবিশিষ্ট বাড়িঘর। বিকিরণ বা ধূলিঝড় থেকে রেহাই পেতে ভূগর্ভে কিংবা গ্রহের বিভিন্ন ‘লাভাটিউব’-এ (lavatubes) মাথা গোঁজার ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়।

কিন্তু ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। মঙ্গলকে বাসযোগ্য করে তুলতে গেলে গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে পৃথিবীর মতই করে তুলতে হবে। মঙ্গলের মেরুদ্বয়ে ‘শুষ্ক বরফ’ (dry ice) প্রচুর পরিমাণে মজুত। তাকে কোনোভাবে গলানো গেলে তার থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড বেরিয়ে তৈরী হবে পুরু বায়ুস্তর। আবহাওয়া উষ্ণতার ছোঁয়া পাবে। হানিকারক রশ্মি মঙ্গলপৃষ্ঠে পৌঁছবে না। এদিকে জলীয় বাষ্প থেকে মেঘ তৈরী হলে তা থেকে বৃষ্টি হবে। এভাবে গোটা ব্যাপারটা সফল হলে মঙ্গলও শস্যশ্যামলা হয়ে উঠবে। পৃথিবীর মত মঙ্গলকেও ‘terraform’ করা সম্ভব হবে।

এতক্ষণ যা পড়লেন, তা হয়ত কল্পকথা মনে হতে পারে। কিন্তু জুলে ভার্ণ-ও তো এরকমই লিখতেন। আজ কি পৃথিবী ঘুরতে আশি দিনও লাগে?