পুনর্জীবন

পুনর্জীবন

লণ্ডন, ১৯১৭
বিকেল ৪টে

রবারের বলটা গড়াতে গড়াতে নীল বেঞ্চটার সামনে এসে থামল। বলটির পিছন পিছন দৌড়তে দৌড়তে হাজির হয়েছে তার মালিকও। বছর তিনেকের ছোট ছেলেটা এগিয়ে এসে নিচু হয়ে বলটা তুলল। কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই কী এক ভয়ে সে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁটদুটো কাঁপছে। পার্কের অন্যদিকে তার মা নিজের বান্ধবীদের সাথে গল্পে মশগুল ছিলেন। সন্তানের উচ্চৈঃস্বরে কান্না শুনে, হন্তদন্ত হয়ে ছুটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি তড়িদাহতের মত ছিটকে গেলেন। পুত্রবৎ, তিনিও নিজের মুখে দু’হাত চেপে ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন। সামনের নীল বেঞ্চে সামরিক পোষাকে ও কে বসে আছে! ও কি মানুষ!

এতক্ষণ বেঞ্চে বসে থাকা যুবকটি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নিচু করে উঠে গেল। নীল বেঞ্চগুলি আসলে তার মত সৈনিকদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। ভদ্রমহিলা তাঁর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে একপাশে সরে দাঁড়ালেন। তার মুখের দিকে তাকানো যায় না। আবার না তাকিয়েও পারা যায় না।

রাস্তা পেরিয়ে যুবকটি তার এক কামরার ঘরে ঢুকে টিমটিমে বাল্বটা জ্বালিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। অন্যদের কীই বা দোষ! সে নিজেই যে আর নিজেকে চিনতে পারে না।

এককালের সুপুরুষ এই যুবক যুদ্ধে গিয়েছিল। কপালক্রমে বেঁচেই ফিরেছে। কিন্তু অক্ষত অবস্থায় নয়। হেলমেটটা বোমার আঘাত থেকে রক্ষা করলেও, চোখে মুখে শ্র‍্যাপনেল ঢুকে গিয়েছিল। সার্জেন বাধ্য হয়েই তার নাক আর একটা চোখ বাদ দেন। প্রাণে সে বেঁচেছে কিন্তু…

নাঃ! এই দুঃসহ জীবন রাখার নয়। ড্রয়ার খুলে যুবকটি তার পিস্তলে গুলি ভরে নলটা গলায় ঠেকাল। সহসা সে শুনতে পেল তার কামরার দরজায় কেউ জোরে করাঘাত করছে। যুবকটির হাত কাঁপছে। ক্ষণিকের অসতর্কতায় সে এ কী করতে যাচ্ছিল!

দরজা খুলতেই যুবকটি দেখে তার বন্ধু দণ্ডায়মান। সেও আরেক যুদ্ধফেরত সৈনিক। তার ক্ষেত্রে অবশ্য থুতনির কিছু অংশ বাদ গেছে। কিন্তু আগন্তুককে এত খুশি দেখাচ্ছে কেন! এ কী! তার থুতনি যে আগের মত জোড়া লেগে গেছে! যুবকটির বন্ধু তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেও তার ধন্ধ কিন্তু তখনো কাটেনি।

———————————————————

না, এ কোনো ভোজবাজি নয়। এর নাম ‘anaplastology’। শরীরের হারানো অংশকে কৃত্রিমভাবে প্রতিস্থাপন করার উপায়। বলা যায়, প্লাস্টিক সার্জারির ‘সিকোয়েল’। “সার্জেনের কাজ যেখানে শেষ, সেখান থেকে এই কাজ শুরু হয়।” এই উক্তি যাঁর, তিনিই এই যুগান্তকারী শিল্পের জনক – ফ্রান্সিস ডারওয়েন্ট উড। ডাক্তার তিনি ছিলেন না। ছিলেন একজন ভাষ্কর বা sculptor। 3rd London General Hospital-এ আর্দালির কাজ করতে করতেই তাঁর মাথায় এই চিন্তার বীজ রোপিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে বহু সৈনিক মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগতে শুরু করে। অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এই শূরবীরদের মুখশ্রী এবং সেই সাথে তাদের মানসিক স্থিতি কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই লক্ষ্যে উড তাঁর মুখোশ নির্মাণের কাজ চালু করলেন – হাসপাতালেরই ‘Masks for Facial Disfigurement Department’-এ। লোকে বলত ‘The Tin Noses Shop’।

লণ্ডনে ১৯১৬-এর মার্চ থেকে এই কাজ শুরু হয়। এরপর ১৯১৭-এর শেষদিকে আমেরিকান রেডক্রসের তত্ত্বাবধানে প্যারিসেও খুলল ‘Studio for Portrait Masks’। এর দায়িত্বে রইলেন আমেরিকার এক মহিলা ভাষ্কর – অ্যানা কোলম্যান ওয়াটস ল্যাড ও তাঁর চারজন সহকারী।

ল্যাডের স্টুডিওতে একটা মুখোশ তৈরি হতে লাগত প্রায় এক মাস। প্লাস্টিক সার্জারির পর ছাড়া পাওয়া সুস্থ ‘রোগীর’ মুখের আদলটি ধরে রাখা হত প্লাস্টারের ছাঁচে। এরপর মাটি বা প্লাস্টিসিনে মুখাকৃতি নির্মাণ করে, রোগীর প্রাকযুদ্ধের ছবি দেখে, ১/৩২ ইঞ্চি পুরু তামার পাতে তৈরি হত মুখোশ। চশমার মত দু’কানে ঝুলিয়ে সেটা পরতে হত। পুরো পদ্ধতির সর্বকঠিন ধাপ ছিল শেষেরটা – মুখোশ রঙ করা। চামড়ার রঙের সাথে সামঞ্জস্য না রাখলে তো চলবে না। আবার রোদে বা মেঘলা দিনে চামড়ার ঔজ্জ্বল্যের তারতম্যকে মাথায় রাখতে হবে। ল্যাড বুঝলেন তেলরঙের থেকে শক্ত এনামেল দিয়ে রঙ করা শ্রেয়। রোগীর মুখে মুখোশ পরিয়ে চলত তাঁর সূক্ষ্ম, ধৈর্য্যসাপেক্ষ রঙ করার কাজ। ১৯১৯ নাগাদ ল্যাডের স্টুডিওতে প্রায় ১৮৫টি মুখোশ তৈরি হয়। উডের স্টুডিওতে কাজ অপেক্ষাকৃতভাবে তাড়াতাড়ি হলেও, মোট কটি মুখোশ সেখানে তৈরি হয়েছিল তা অজানা।

শুরুর সেই সৈনিকের গল্পটা মনগড়া ঠিকই, কিন্তু উড আর ল্যাডের দাক্ষিণ্যে, স্বল্পপ্রযুক্তির যুগেও কিছু পর্যুদস্ত মানুষ যে নবজীবন লাভ
করেছিলেন, তা অনস্বীকার্য।

ছবি সৌজন্যঃ রেয়ার হিস্টরিকাল ফোটোস