অগ্ন্যুৎপাতের ভিন্ন তত্ত্ব 

অগ্ন্যুৎপাতের ভিন্ন তত্ত্ব 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ এপ্রিল, ২০২৬

অগ্ন্যুৎপাত প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ফোরক ও ভয়ংকর ঘটনাগুলোর একটি। এর চিরাচরিত প্রচলিত ব্যাখ্যা হল: ম্যাগমার ভেতরে জমে থাকা গ্যাসের বুদবুদ যত বাড়ে, ততই চাপ বৃদ্ধি পায়, আর একসময় তা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ফেটে বেরিয়ে আসে। অনেকটা শ্যাম্পেনের বোতল খোলার পর ফেনা বেরিয়ে আসার মতো। কিন্তু সাম্প্রতিক এক নতুন গবেষণা এই চিরাচরিত ধারণা নিয়ে সংশয় প্রকাশ তো করেইছে এবং এটাও তুলে ধরেছে যে আমরা এতদিন হয়তো সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো ব্যাখ্যাই বিশ্বাস করে এসেছি। আসল ধারণাটা একেবারেই ভিন্ন। বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, অগ্ন্যুৎপাতের সূচনা হতে পারে ঠিক বিপরীত প্রক্রিয়ায়—যখন বুদবুদ ম্যাগমার মধ্যে আবার শোষিত হয়ে যায়।

জাপানের আসো পাহাড় আগ্নেয়গিরির প্রায় ৮৬,০০০ বছর আগের এক বৃহৎ অগ্ন্যুৎপাতকে ঘিরে এই নতুন ব্যাখ্যার সূচনা। এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’ পত্রিকায়। বিজ্ঞানীরা শিলার ভেতরে থাকা অ্যাপাটাইট খনিজ বিশ্লেষণ করে ম্যাগমার অতীত আচরণ বোঝার চেষ্টা করেছেন। এই খনিজে গ্যাসীয় উপাদান, যেমন- ক্লোরিন ও ফ্লোরিনের উপস্থিতি ম্যাগমায় বুদবুদের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়।

গবেষণার মূল পর্যবেক্ষণটি ছিল আরও বিস্ময়কর। ছোট আকারের পুরনো অগ্ন্যুৎপাতের নমুনায় গ্যাসের বুদবুদের উপস্থিতির প্রমাণ মিললেও, বৃহৎ অগ্ন্যুৎপাতের নমুনায় সেই বুদবুদের চিহ্ন প্রায় অনুপস্থিত। এবার এখানেই প্রশ্ন আসে: যদি বুদবুদ না থাকে, তবে বিস্ফোরণ কীভাবে ঘটলো? এই অস্বাভাবিক ফলাফলের পর থেকেই বিজ্ঞানীরা নতুন ব্যাখ্যার প্রতি মনোনিবেশ করেন।

আজকে গবেষকদের ব্যাখ্যা একেবারেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। তাদের মতে, বুদবুদ ম্যাগমাকে কিছুটা নমনীয় রাখে অর্থাৎ, চাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন এই বুদবুদগুলো ম্যাগমার মধ্যে আবার মিলিয়ে যায় বা শোষিত হয়, তখন ম্যাগমা হয়ে ওঠে কঠোর ও অনমনীয়। ফলে সামান্য চাপও দ্রুত বেড়ে গিয়ে একসময় বিস্ফোরণের রূপ নেয়।

এই ধারণাকে আগ্নেয়গিরি-বিজ্ঞানে অগ্ন্যুৎপাতকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ “প্যারাডাইম শিফট’’ বা চিন্তাধারার পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ অবশ্য এখনো এই নতুন ধারণা নিয়ে সহমত হয়েও হতে পাড়ছেন না। কারণ প্রাচীন শিলায় গ্যাসের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা অত্যন্ত জটিল, সেক্ষেত্রে গ্যাসের উপস্থিতির পাশাপাশি গ্যাসের অনুপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিস্ফোরণের কারণটা সবসময় বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান নাও তো হতে পার। হয়তো সামান্য কোনো অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের কারণেও সেটা ঘটে থাকতে পারে। মোটকথা এই নতুন তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধারণা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে যে বৃহৎ আগ্নেয়গিরিগুলোর আচরণ এখনো আমরা পুরোপুরি বুঝি না। কথাটা বিশেষ করে প্রযোজ্য আসো পাহাড়ের মতো সুপ্ত আগ্নেয়গিরি ক্ষেত্রে, যেগুলো দীর্ঘ সময় নিস্তব্ধ থাকার পর হঠাৎ জেগে উঠতে পারে। এই গবেষণা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বিজ্ঞান কখনো স্থির নয়। নতুন তথ্য, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, আর অজানাকে জানার অবিরাম প্রচেষ্টা—এই সবকিছুকে পাথেয় করে বিজ্ঞান এগিয়ে চলে, আর আমাদের পরিচিত জ্ঞানের ভাণ্ডারকে প্রতিনিয়ত নতুন করে সাজায়।

সূত্র: Long-standing volcanic eruption theory might be backward By Hannah Richter, published in nature communications, 26th March 2026, 10:45 AM ET.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + 7 =