আধুনিক জীবনযাত্রায় প্লাস্টিকের ব্যবহার অপরিহার্য। খাদ্যদ্রব্যের প্যাকেট, জলের বোতল, গৃহস্থালির সামগ্রী থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও শিল্পক্ষেত্র—সর্বত্র প্লাস্টিকের উপস্থিতি। সহজলভ্যতা, কম দাম, হালকা ওজন এবং স্থায়িত্বের কারণে প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, ব্যবহারের পর তা দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে যায়। বিশেষত সমুদ্রের জলে জমে থাকা প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা সামুদ্রিক প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। এই সমস্যার সমাধানে নতুন আশার আলো দেখালেন জাপানের গবেষকেরা। তাঁদের তৈরি এক অভিনব প্লাস্টিক সমুদ্রের জলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পূর্ণ ভেঙে যেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, মাটিতে মিশে গিয়ে এই উপাদান মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে।
জাপানের রাইকেন সেন্টার ফর এমার্জেন্ট ম্যাটার সায়েন্সের গবেষকেরা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় এই নতুন প্লাস্টিক তৈরি করেছেন। তাকুজো আইদা-র নেতৃত্বে গবেষকদলটি তৈরি করেছে এক ধরনের সুপ্রা-মলিকিউলার প্লাস্টিক, যার উপাদানগুলির মধ্যে বন্ধন শক্তিশালী হলেও বিশেষ পরিবেশে তা সহজেই ভেঙে যায়। গবেষণাটি ২০২৪ সালে সায়েন্স পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
এই প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে সোডিয়াম হেক্সামেটাফসফেট। এটি খাদ্যশিল্পে ব্যবহৃত একটি সাধারণ সংযোজক, যা সার তৈরিতেও কাজে লাগে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত গুয়ানিডিনিয়াম আয়নভিত্তিক মনোমার। এই উপাদানগুলি পরস্পরের সঙ্গে শক্তিশালী অথচ প্রত্যাবর্তনযোগ্য লবণ-সেতু বন্ধন তৈরি করে। ফলে প্লাস্টিকটি স্বচ্ছ, মজবুত এবং সহজে প্রক্রিয়াকরণযোগ্য। তা প্রচলিত পেট্রোলিয়ামজাত প্লাস্টিকের মতো ব্যবহারযোগ্য তো বটেই, উপরন্তু অদাহ্য এবং তাপ-সহ।
এই আবিষ্কারের বিশেষত্ব হলো, লবণাক্ত জলের সংস্পর্শে এলে প্লাস্টিকটির গঠন ভেঙে পড়ে। সমুদ্রের জলে যে ইলেকট্রোলাইট থাকে তা উপাদানগুলির মধ্যকার বন্ধন দুর্বল করে দেয়। ফলে প্লাস্টিকটি প্রায় এক থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে তার মূল মনোমার উপাদানে ভেঙে যায়। অবশ্য এই সময়টা প্লাস্টিকের পুরুত্বের ওপর নির্ভর করে। পরে সামুদ্রিক ব্যাকটেরিয়া এই উপাদানগুলিকে বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করতে পারে। ফলে স্থায়ী মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
মাটিতেও এই প্লাস্টিকের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার আকারের এক টুকরো মাটিতে প্রায় ২০০ ঘণ্টা বা দশ দিনের মধ্যে এটি ভেঙে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় নাইট্রোজেন ও ফসফরাস প্রভৃতি পুষ্টি উপাদান মুক্ত হয়, যা মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে।
সাধারণ জৈব-বিয়োজ্য প্লাস্টিকের তুলনায় এই উপাদানের বিশেষত্ব হলো, এটি সামুদ্রিক পরিবেশেও দ্রুত ভাঙতে পারে এবং দূষণকারী মাইক্রোপ্লাস্টিকের অবশিষ্টাংশ তৈরি করে না। এর মনোমার পুনরুদ্ধার করে পুনরায় ব্যবহার করার সম্ভাবনাও রয়েছে, যা চক্র অর্থনীতির ধারণাকে এগিয়ে নিতে পারে।
তবে এই প্লাস্টিক এখনও বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসেনি। দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী করতে এবং দ্রুত-বিয়োজ্য বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখতে গবেষকেরা এর ওপর সুরক্ষামূলক আবরণ তৈরির কাজ করছেন। সফল হলে প্যাকেজিং শিল্পে এই আবিষ্কার পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক তৈরিতে নতুন পথের দিশা দেখাবে।
সূত্র:
https://www.facebook.com/share/p/1FAcSZYKSs/
