কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে এবার প্রথমবারের মতো অতিশীতল পারমাণবিক গ্যাসে শ্যাপিরো স্টেপ দেখা গেছে। জার্মানি ও ইতালির দুটি গবেষকদল স্বাধীনভাবে এই পর্যবেক্ষণ করেছে। এই গবেষণাটি কোয়ান্টাম পদার্থের আচরণ বোঝার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাসায়নিক বিভবের একটি নির্ভুল মানদণ্ড তৈরিতেও কাজে লাগতে পারে।
শ্যাপিরো স্টেপ কী? শ্যাপিরো স্টেপের ধারণাটি এসেছে জোসেফসন জংশন থেকে। ১৯৬২ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিদ ব্রায়ান জোসেফসন দেখিয়েছিলেন, দুটি অতিপরিবাহীকে একটি অতি পাতলা নিরোধক দিয়ে আলাদা করলে তাদের মধ্যকার কোয়ান্টাম তরঙ্গের দশার পার্থক্যের কারণে বৈদ্যুতিক প্রবাহ সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি দুই পাশে বিভবের পার্থক্য না থাকলেও এই প্রবাহ সম্ভব।
এর এক বছর পর সিডনি শ্যাপিরো ও তাঁর সহকর্মীরা দেখান, জোসেফসন জংশনে মাইক্রোওয়েভের মতো পর্যায়ক্রমিক বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র প্রয়োগ করলে বিভব পার্থক্য মসৃণভাবে না বেড়ে হঠাৎ হঠাৎ নির্দিষ্ট ধাপে বাড়ে। এই আকস্মিক ধাপগুলিই শ্যাপিরো স্টেপস নামে পরিচিত। প্রতিটি ধাপের উচ্চতা নির্ভর করে প্রযুক্ত তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের কম্পাঙ্ক এবং বৈদ্যুতিক আধানের ওপর। বর্তমানে এই বৈশিষ্ট্যকে অত্যন্ত নির্ভুল ভোল্টের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এই নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা অতিপরিবাহীর বদলে ব্যবহার করেছেন অতিশীতল পারমাণবিক গ্যাস। লেজার রশ্মি দিয়ে গ্যাসের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজক বা সম্ভাব্য বাধা তৈরি করে একটি জোসেফসন জংশনের মতো ব্যবস্থা বানানো হয়। পরে বাধাটিকে নির্দিষ্টভাবে নাড়িয়ে পরমাণুগুলোর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। স্থির গতিতে পরমাণু সরিয়ে তাঁরা DC/ সমপ্রবাহের অনুকরণ করেন, আর বাধাটিকে সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করিয়ে তৈরি করেন AC/পর্যায়বৃত্ত তড়িৎ প্রবাহ।
জার্মানির হারউইগ অটের দল রুবিডিয়াম-৮৭ পরমাণু দিয়ে তৈরি বোস আইনস্টাইন কনডেনসেট ব্যবহার করে শ্যাপিরো স্টেপ দেখতে পান। অন্যদিকে ইতালির জুলিয়া দেল পাসের দল ব্যবহার করেন অতিশীতল লিথিয়াম-৬, যা একটি ফার্মিয়ন গোত্রের মৌলিক কণা।
দুটি পরীক্ষাতেই তাত্ত্বিকভাবে পূর্বাভাসিত শ্যাপিরো স্টেপ দেখা যায়। তবে এর গুরুত্ব শুধু তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণে নয়। অতিপরিবাহীতে এই ঘটনা ঘটে দুটি ইলেকট্রনের যুগলবন্দী বা কুপার জোট ভাঙনের মাধ্যমে। আর অতিশীতল গ্যাসের ক্ষেত্রে এটি ঘটে আবর্ত/ঘূর্ণি বলয় তৈরি হওয়ার জন্য। অর্থাৎ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা হলেও দু- ক্ষেত্রেই একই গাণিতিক নিয়ম কাজ করছে।
এছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরস্পরের সঙ্গে শক্তিশালীভাবে ক্রিয়াশীল ফার্মিয়ন গ্যাসেও এই ধাপ দেখা গেছে। মোটকথা, একটি শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া কোয়ান্টাম গতিবিদ্যাকে বাধা না দিয়ে বরং আরও কার্যকর করতে পারে। ফলত ভিন্ন ভিন্ন কোয়ান্টাম সিস্টেমে একই মৌলিক নিয়ম কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার নতুন একটা পথের হদিশ মিলল।
সূত্র: https://physicsworld.com/a/shapiro-steps-spotted-in-ultracold-bosonic-and-fermionic-gases/
