বাদুড় মূলত রাতের অন্ধকারে সক্রিয় হয়, নিঃশব্দে শিকার করে, লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে খুব কম। ফলে বাদুড়কে অনেক সময় “অদৃশ্য স্তন্যপায়ী’’ বলা হয়। কিন্তু সম্প্রতি উত্তর আমেরিকার ছয়টি বাদুড় প্রজাতি নিয়ে একটি চমকপ্রদ আবিষ্কার হয়েছে। গবেষকরা দেখেছেন, অতিবেগুনি আলোতে এই বাদুড়গুলোর শরীর থেকে অদ্ভুত এক সবুজ আভা বের তে হয়। জর্জিয়া মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির বিজ্ঞানীরা ৬০টি সংরক্ষিত নমুনা পরীক্ষা করে দেখেন, প্রতিটি বাদুড়ই অতিবেগুনি আলোতে সবুজ রঙে জ্বলে ওঠে। আগে কিছু পোকামাকড়, উদ্ভিদ এবং কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা গেলেও, উত্তর আমেরিকার বাদুড়ের ক্ষেত্রে এটি এই প্রথমবার নথিভুক্ত হল। বাদুড়গুলোর শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশ, বিশেষ করে ডানা এবং পেছনের পা সবচেয়ে বেশি জ্বলে ওঠে। সব প্রজাতির বাদুড় একই জায়গায় এবং একই রঙে জ্বলে ওঠায় বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি প্রজাতি বা লিঙ্গ ভেদে আলাদা করে কাজ করে না। তবে এই জ্বলজ্বলে বৈশিষ্ট্যের আসল উদ্দেশ্য কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। গবেষকদের ধারণা, এটি হয়তো কোনো প্রাচীন অভিযোজনের অবশিষ্টাংশ, যা সময়ের সঙ্গে রয়ে গেছে। জীবিত বাদুড়ের উপর আরও গবেষণা করলে এর প্রকৃত কারণ হয়ত জানা যাবে। বাদুড়দের আচরণও সমান চমকপ্রদ। খাদ্য ও প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি অনুযায়ী এরা আচরণ বদলে ফেলে। বিশেষ করে মিশরীয় ফলখেকো বাদুড় ও কালো ইঁদুরের মধ্যে এই সম্পর্কটি বেশ জটিল। এরা একই এলাকায় থাকলে খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা করে, কখনও কখনও একে অপরকে শিকারও করে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সাত মাস ধরে একটি আধা-প্রাকৃতিক পরিবেশে তোলা কয়েকশ ঘণ্টার ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখেন, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাদুড়ের আচরণও বদলে যায়। শীতকালে, যখন খাবার কম থাকে এবং ইঁদুরের আক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে, তখন বাদুড়রা খুব সতর্ক থাকে। তারা কমই মাটিতে নামে এবং বেশি সময় সতর্ক অবস্থাতেই কাটায়, ফলে তাদের খাদ্য সংগ্রহের দক্ষতা কমে যায়। কিন্তু আবহাওয়া উষ্ণ হলে এবং খাবার সুলভ হলে, বাদুড়রা বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা তখন বেশি করে মাটিতে নামে, বেশি খায়, এমনকি কখনও কখনও ইঁদুরদের আক্রমণও করে। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সম্পর্ক সবসময় সরল নয়, পরিবেশ অনুযায়ী তা বদলে যায়। প্রাণীরা নিজেদের আচরণ মানিয়ে নিতে সক্ষম। এর পাশাপাশি, বিজ্ঞানীরা এখনও নতুন নতুন বাদুড় প্রজাতি আবিষ্কার করে চলেছেন। ফিলিপিন্সের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্যে গবেষণা করে সম্প্রতি ছয়টি নতুন প্রজাতির বাদুড়ের নামকরণ করা হয়েছে। এরা “টিউব-নোজড’’ বাদুড় নামে পরিচিত এবং মুরিনা গণের অন্তর্ভুক্ত। গবেষকরা শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ ও জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই নতুন প্রজাতিগুলোর সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। বাদুড় সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বেশি নয়। তাদের শরীর, আচরণ এবং বিবর্তন নিয়ে যত গবেষণা হচ্ছে, ততই নতুন রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে। ছোট, নিঃশব্দ এই প্রাণীগুলো প্রকৃতির জটিলতা ও বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠছে।
সূত্র: Nautilus Magazine; April, 2026
