অধ্যাপক অমল কুমার রায়চৌধুরী ও তাঁর সমীকরণ

অধ্যাপক অমল কুমার রায়চৌধুরী ও তাঁর সমীকরণ

অধ্যাপক অর্ণব রায়চৌধুরী
আই আই এস সি-র (ব্যাঙ্গালোর) প্রাক্তন অধ্যাপক ; বিষয় : Astrophysical Magnetohydrodynamics.
Posted on ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

(পর্ব – ১)

গোড়ার কথা

আমার এই প্রবন্ধের সব পাঠকই নিশ্চয় জানেন, দুই বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন বোস বিরাট বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছিলেন ‘সাহা আয়নন তত্ত্ব’ ও ‘বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান’ নিয়ে তাঁদের কাজের জন্য। ১৯২০ ও ১৯২৪ সালে যখন এই কাজ দু’টো প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন পরাধীন ভারতে স্বাধীনতা-আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হয়ে উঠছে। পরাধীন বাংলার বিদ্বসমাজের কাছে সাহা ও বোস বিজ্ঞানে স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠলেন – যাঁরা প্রমাণ করে দেখালেন যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে বাঙালি নিজের স্থান করে নিতে পারে । এখানে উল্লেখ করা দরকার, কলকাতাতেই গবেষণা করে সি ভি রামন ১৯২৮ সালে ‘রামন বিচ্ছুরণ’ আবিষ্কার করেছিলেন । রবীন্দ্রনাথের পরে তিনিই ভারতবর্ষের দ্বিতীয় নোবেল প্রাইজ কলকাতায় নিয়ে আসেন ১৯৩০ সালে । তবে ১৯৩৩ সালে রামন বেঙ্গালুরুর Indian Institute of Science-এর অধিকর্তা হয়ে কলকাতা ছেড়ে চলে যান ।

দেশ যখন সবে স্বাধীন হয়েছে সেই সময়ে কলকাতাতেই কাজ করে আরও একজন বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী অমলকুমার রায়চৌধুরী ১৯৫৫ সালে একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন – যা সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের গবেষণার ধারাকে প্রায় ভিন্নমুখী করে দেয় । অমলবাবুর এই কাজটাই ১৯৫০-এর দশকে ভারতবর্ষ থেকে করা পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে আজ বিজ্ঞানীমহলে সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, আত্মপ্রচারবিমুখ অমলবাবুর এই কাজটার কথা অল্প- কয়েকজন বিশেষজ্ঞের বাইরে আমাদের দেশের বিজ্ঞানের জগতের মানুষরাও অনেক বছর কেউ খুব একটা কিছু জানতেন না। এখনও তাঁর নাম বোধহয় অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত বাঙালিরই জানা নয় । মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন বোসের ক্ষেত্রে যেমন তাঁদের বিখ্যাত কাজগুলো প্রকাশিত হবার অল্পদিনের মধ্যেই বাংলার বিদ্বমহলে তাঁদের খ্যাতি ছড়িয়ে গিয়েছিল, তেমনটা অমল রায়চৌধুরীর ক্ষেত্রে হয় নি ।

অমলবাবু অনেক বছর প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপনা করেছিলেন । আমি যখন ১৯৭০-এর দশকে প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে B.SC করেছিলাম তখন আমার অমলবাবুর ক্লাস করার সৌভাগ্য হয় । পদার্থবিজ্ঞান পড়াবার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য তিনি আমাদের কাছে ছিলেন প্রায় পদার্থবিজ্ঞানের দেবতার মতো । কিন্তু আমরা তাঁকে পদার্থবিজ্ঞানের একজন কিংবদন্তীপ্রতিম শিক্ষক বলেই জানতাম । তাঁর বক্তৃতা শোনার সময়ে আমাদের ক্লাসের কারোরই বোধহয় খুব একটা স্পষ্ট ধারণা ছিল না যে, আমরা একজন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীর বক্তৃতা শুনছি । অতি-বিনয়ী অমলবাবুও কখনও তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি যে কোন স্তরের তাই নিয়ে ছাত্রদের সামনে ঘুণাক্ষরেও কোনও ইঙ্গিত করেন নি । একতলার ল্যাবরেটরির পেছনে একটা খুব ছোটো ঘরে অমলবাবু বসতেন। একটা বইয়ের আলমারি, একটা মাঝারি-আয়তনের টেবিল আর গোটা-তিনেক চেয়ার রাখার পরে সেই ঘরে আর প্রায় কারও নড়াচড়া করার জায়গা ছিল না। আমরা কেউ কেউ পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে মনে কোনও প্রশ্ন এলে নির্দ্বিধায় ওই ঘরে গিয়ে অমলবাবুর কাছে প্রশ্নটা পেশ করতাম। তিনিও ধৈর্য ধরে আমাদের ব্যাপারটা বোঝাতেন । আমরা যে একজন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীর অমূল্য সময় নষ্ট করছি সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারলে আমাদের হয়তো এভাবে তাঁকে বিরক্ত করার দুঃসাহস হত না । আমরাও তখন সেটা বুঝতাম না, ছাত্রদরদী অমলবাবুও কখনও আমাদের সেটা বুঝতে দেন নি ।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট করতে গিয়ে প্রথম আমার অমলবাবুর আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পর্কে খানিকটা ধারণা হয় । মনে আছে, শিকাগোতে পৌঁছাবার অল্পদিন পরে একদিন ক্লাসরুমে আমাদের ক্লাস করতে গেছি, দেখলাম ব্ল‍্যাকবোর্ডের ওপরে Raychaudhuri equation লেখা রয়েছে । বুঝতে পারলাম, আগের ক্লাসটাতে Raychaudhuri equation নিয়ে আলোচনা হয়ে গেছে । সেদিন যে গর্বে কতটা বুক ফুলে উঠেছিল তা এখনও মনে করতে পারি। শিকাগোতে আমাদের একজন সিনিয়র দাদার একটা মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিল । তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশুনা করেছেন শুনে শিকাগোর একজন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক সসম্ভ্রমে প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি তবে প্রফেসর রেকাঢুরির ক্লাস করেছ ?” ‘প্রফেসর রেকাঢুরি’ যে কে সেটা আমাদের এই সিনিয়র দাদা অনেকক্ষণ ঠিক বুঝে উঠতে পারেন নি !

অধ্যাপক অমল রায়চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত গবেষণাটা করেছিলেন অত্যন্ত প্রতিকূল একটা অবস্থার সঙ্গে সংগ্রাম করতে করতে । যে মেঘনাদ সাহাকে অমলবাবু পদার্থবিজ্ঞানে অবদানের জন্য গভীর শ্রদ্ধা করতেন এবং যিনি অনুজ বিজ্ঞানীদের অনুপ্রেরণা দেবেন বলে অমলবাবু আশা করেছিলেন, সেই মেঘনাদ সাহাই সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে অমলবাবুর গবেষণা বন্ধ করে দেবার চেষ্টা করেছিলেন । এই গভীর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা আমরা কলেজে পড়বার সময়ে একবার অমলবাবু আমাদের কয়েকজনকে বলেছিলেন । আমরা তাঁকে বলেছিলাম, ভাবীকালের জন্য তাঁর এই অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করে যেতে । তিনি আমাদের বলেছিলেন, আমাদের তিনি এটা বললেন কারণ তিনি চান পরের প্রজন্মের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্ররা এটা জানুক, তবে এটা লিখে যাওয়া তাঁর পক্ষে অনুচিত হবে । যখন তিনি ৭৯ বছর বয়সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং তাঁর মনে হয়েছিল তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না, তখন হঠাৎ এই অভিজ্ঞতার কথা লিখে যাবার জন্য তিনি মনের মধ্যে একটা তাগিদ অনুভব করেন এবং হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়েই লেখার জন্য তিনি হাতে কলম তুলে নেন । গবেষণা-জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা তাঁর নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ ‘আত্মজিজ্ঞাসা’ তাঁর মৃত্যুর পরে শরৎ বুক ডিস্ট্রিবিউটারস থেকে আরও অন্য কিছু লেখার সঙ্গে একত্রে ‘আত্মজিজ্ঞাসা ও অন্যান্য রচনা’ নামে প্রকাশিত হয় ।

এবার অমলবাবুর বিখ্যাত আবিষ্কারটি জটিলতা পরিহার করে একটু বোঝাবার চেষ্টা করা যাক । তার পরে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করা যাবে ।

 

রায়চৌধুরী সমীকরণ কি ও কেন ?

‘আত্মজিজ্ঞাসা’ প্রবন্ধটিতে অমল রায়চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত কাজটা যে কী সেটা বোঝাবার চেষ্টা করেন নি, যদিও প্রবন্ধটির একেবারে শেষে তিনি লিখেছেন, “অনেকবার ভেবেছি যে কাজের জন্য আমি কিছুটা বিশ্ববিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃতি পেয়েছি তা সহজসরল ভাষায় গণিত বর্জন করে শিক্ষিত বাঙালি সমাজে পেশ করি। কিন্তু ভেবে মনে হল তা সুচারুভাবে করার ক্ষমতা আমার নেই । তাই সে বিষয়ে নীরব রইলাম ।“ যা নিয়ে সহজ ভাষায় আলোচনা করতে স্বয়ং অমলবাবু দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাই নিয়ে আমার আলোচনা করতে যাওয়াটা কি বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবার চেষ্টা হয়ে যাবে না ?

তবে এই আলোচনা করার ব্যাপারে অমলবাবুর তুলনায় আমার একটা বিরাট সুবিধা রয়েছে। অতি-বিনয়ী অমলবাবু সব সময়েই নিজের কাজ নিয়ে কাউকে কিছু বলতে হলে সংকুচিত হয়ে উঠতেন । আর আমাকে আলোচনা করতে হবে আমার গুরুর কাজ নিয়ে ! গুরুর আশীর্বাদে তাঁর কাজের তাৎপর্য খানিকটা সহজ করে আপনাদের বোঝাতে পারি কিনা একটু চেষ্টা করে দেখা যাক ।

১৯২৯ সালে হাব্‌ল আবিষ্কার করলেন, মহাবিশ্বের সমস্ত গ্যালাক্সি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং যে গ্যালাক্সি যত দূরে সেই গ্যালাক্সির আমাদের থেকে দূরে সরে যাবার বেগও তত বেশি । এর থেকে বোঝা গেল, আমাদের মহাবিশ্ব ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হয়ে চলেছে । ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতার যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, সেই তত্ত্বের সাহায্যে প্রসারণশীল বিশ্বের গাণিতিক বিশ্লেষণ করা সম্ভব হল । এই বিশ্লেষণের জন্য অনেক সময়েই ধরে নেওয়া হয়, মহাবিশ্ব সমসত্ত্ব এবং সবদিকে সমভাবে প্রসারিত হচ্ছে । এই ধরণের প্রসারণ চিত্র ২ক-তে দেখানো হয়েছে । মহাবিশ্ব এইভাবে প্রসারিত হচ্ছে ধরে নিলে আমাদের যে সিদ্ধান্তে আসতে হয় তা হল, সুদূর অতীতে মহাবিশ্বের একটা সৃষ্টির আদি মুহূর্ত ছিল যখন মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তুই একটা বিন্দুতে জমা হয়ে ছিল এবং তখন মহাবিশ্বের ঘনত্ব ছিল অসীম । এই অবস্থাকে সিঙ্গুলারিটি (singularity) বলে । এইরকম অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞানের কোনও নিয়মই আর প্রয়োগ করা যায় না। এইরকম একটা সিঙ্গুলারিটি থেকে আমাদের মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এই ভাবনাটাকে অনেক পদার্থবিজ্ঞানীই মেনে নিতে পারছিলেন না। মহাবিশ্ব সবদিকে সমভাবে প্রসারিত হচ্ছে এই প্রকল্পটা মেনে না নিলে কি সিঙ্গুলারিটির সম্ভাবনাটা এড়ানো যায় ?

 

চিত্র ২খ-তে মহাবিশ্বের আরেকটু জটিল একটা সম্ভাব্য প্রসারণ দেখানো হয়েছে । যদি মহাবিশ্ব এইভাবে প্রসারিত হচ্ছে এটা আমরা ধরে নিই, তবেও কি আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদিতে একটা সিঙ্গুলারিটি ছিল? এই প্রশ্নটার উত্তর দেওয়াটা একেবারেই সহজসাধ্য ব্যাপার নয় । এই প্রশ্নটার উত্তর বের করতে গেলে আমাদের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের জটিল গাণিতিক তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে হবে । এই বিশ্লেষণটাই করেছিলেন অধ্যাপক অমলকুমার রায়চৌধুরী । তিনি দেখালেন, চিত্র ২খ-তে প্রসারণের যে ধরণ দেখানো হয়েছে সেইভাবে যদি মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে তবে সেই প্রসারণের জন্য একটা সৌষ্ঠবপূর্ণ সুন্দর সমীকরণ বের করে ফেলা যায় । এই সমীকরণটাই পরে Raychaudhuri equation বা রায়চৌধুরী সমীকরণ নামে অভিহিত হয় । অনেকেই হয়তো জানেন, সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের গাণিতিক তত্ত্ব পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে দুরূহ ও জটিল গাণিতিক তত্ত্বগুলোর মধ্যে অন্যতম মনে করা হয় । এই জটিল তত্ত্বের ভেতর থেকে এমন একটা সুন্দর সমীকরণ – যার খুব সহজেই ব্যাখ্যা দেওয়া যায় – তা যে বের করে ফেলা যেতে পারে তা বোধহয় এই বিষয়ে গবেষণারত আর কোনও বিজ্ঞানীই আগে ভাবতেও পারেন নি ।

মহাবিশ্বের প্রসারণ যদি চিত্র ২খ-এর ধরণের হয় তবে সেই ক্ষেত্রে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সিঙ্গুলারিটি থেকে হয়েছিল এই সিদ্ধান্তটা আমরা এড়াতে পারি কিনা সেই প্রশ্নটার পূর্ণাঙ্গ উত্তর অবশ্য অমলবাবু দিতে পারেন নি । তখনকার দিনের পদার্থবিজ্ঞানীরা যেসব গাণিতিক তত্ত্বের ব্যবহার করতেন তার ভিত্তিতে এই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর দেওয়া সম্ভব ছিল না । ১৯৬০-এর দশকে রজার পেনরোজ ও স্টিফেন হকিং সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের আলোচনায় এক অভিনব ধরণের গাণিতিক তত্ত্বের প্রয়োগ শুরু করলেন । ১৯৫৫ সালে রায়চৌধুরী সমীকরণ আবিষ্কৃত হবার প্রায় এক দশক পরে এই নতুন গণিতের সাহায্য নিয়ে পেনরোজ ও হকিং দেখালেন, রায়চৌধুরী সমীকরণ থেকে বিশ্লেষণ শুরু করে কতগুলো উপপাদ্য প্রমাণ করা যায় । এই উপপাদ্যগুলোই বর্তমানে singularity theorems নামে খ্যাত । এই উপপাদ্যগুলোর ভিত্তিতে অবশেষে বোঝা গেল, মহাবিশ্বের প্রসারণের ধরণটা যদি চিত্র ২খ-এর মতো হয় তাহলেও আমাদের এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয় যে মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছিল একটা সিঙ্গুলারিটি থেকে । মহাবিশ্বের প্রসারণ যদি ধ্রুপদী সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ (অর্থাৎ, যার মধ্যে কোয়ান্টাম তত্ত্বের অবতারণা করা হয় নি) মেনে চলে, তবে সিঙ্গুলারিটির অস্তিত্ব অনিবার্য । মহাবিশ্বের সৃষ্টি যে সিঙ্গুলারিটি থেকে হয়েছিল তার নাম দেওয়া হল মহাবিস্ফোরণ (Big Bang) । ১৯৬৫ সালে আর্নো পেঞ্জিয়াস ও রবার্ট উইলসন নিতান্ত কাকতালীয়ভাবে আবিষ্কার করে ফেললেন যে সমস্ত মহাবিশ্ব জুড়ে একটা অল্প শক্তির বিকিরণ বিদ্যমান রয়েছে । এই বিকিরণ যে মহাবিস্ফোরণের সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল এই সিদ্ধান্তটাই খুব স্বাভাবিক। অধিকাংশ পদার্থবিজ্ঞানী (সকলে নন) এই বিকিরণের অস্তিত্বকে মহাবিস্ফোরণের একটা বড়ো প্রমাণ হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। মহাবিস্ফোরণ থেকেই যে আমাদের মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল এই ধারণাটাই বর্তমানে বিজ্ঞানী-মহলে প্রায় সর্বজনস্বীকৃত ।

১৯১৬ সালে একটি যুগান্তকারী দীর্ঘ গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের গোড়াপত্তন করার পরেই পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে এই তত্ত্বের প্রয়োগ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয় । মহাবিশ্বের গঠন ও বিবর্তনের ইতিহাস এই তত্ত্বের ভিত্তিতে কিভাবে বিশ্লেষণ করা যায় তাই নিয়ে গবেষণা করলেন স্বয়ং আইনস্টাইন ও আরও কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী । কিন্তু তার পরে প্রায় তিন-চার দশক ধরে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে খুব একটা আর গবেষণা হয় নি । যেহেতু অত্যন্ত দুরূহ বিষয় বলে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের একটা ভীতিজনক খ্যাতি হয়ে যায় এবং যেহেতু আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতের কোনও ব্যাপারে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের প্রয়োগের কোনও সম্ভাবনা নেই বলে অনেকদিন মনে করা হত (কেউ কেউ হয়তো জানেন, আজকালকার দিনে গুগ্‌ল ম্যাপে একটা জায়গার অবস্থান নির্দেশ করার জন্য যে প্রোগ্রাম ব্যবহার করা হয় তাতেও সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের প্রয়োগ আছে !), তাই সেই যুগের অধিকাংশ পদার্থবিজ্ঞানীই সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সঙ্গে একটা সসম্ভ্রম দূরত্ব রেখে চলতেন।

সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের ওপরে লেখা কোনও গবেষণাপত্র পড়ে বুঝতে গেলে বিষয়টা সম্পর্কে যতটা জ্ঞান থাকা দরকার সেই জ্ঞান সেযুগের অধিকাংশ পদার্থবিজ্ঞানীরই ছিল না । তার পরে যখন সিঙ্গুলারিটি নিয়ে অনেক পদার্থবিজ্ঞানী ভাবনাচিন্তা শুরু করলেন, তখন হঠাৎ আবার সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের গবেষণা খুব দ্রুতগতিতে এগোতে শুরু করল । সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের বিবর্তনের ইতিহাসের এই পর্যায়টাকে অনেকেই ‘সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের রেনেসাঁস’ বলে অভিহিত করে থাকেন । সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের এই রেনেসাঁসের পুরোধা হলেন অধ্যাপক অমল রায়চৌধুরী – যাঁর রায়চৌধুরী সমীকরণের ওপর ভিত্তি করেই এই রেনেসাঁসের যাত্রাপথ শুরু হয়েছিল বলা হয়ে থাকে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 2 =