‘অবিনশ্বর রাসায়নিক’ বিনাশী নব্য প্রযুক্তি -১

‘অবিনশ্বর রাসায়নিক’ বিনাশী নব্য প্রযুক্তি -১

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ আগষ্ট, ২০২৬

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের নিরিখে সবচেয়ে নাছোড়বান্দা দূষকদের মধ্যে অন্যতম হল পার- অ্যান্ড পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল পদার্থ (PFAS)। এটি ফরএভার কেমিক্যাল/অবিনশ্বর রাসায়নিক নামে পরিচিত। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে অগ্নিনির্বাপক ফোম, নন-স্টিক আবরণ এবং জলরোধী বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহৃত এই রাসায়নিকগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী কার্বন-ফ্লুরিন বন্ধনের কারণে প্রকৃতিতে প্রায় অবিনশ্বর। ফলে এগুলো মাটি, নদী, ভূগর্ভস্থ জল এবং পানীয় জলে বছরের পর বছর থেকে যায়। মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এরা ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ। এই প্রেক্ষাপটে জার্মানির Helmholtz-Zentrum Dresden-Rossendorf (HZDR)-এর গবেষকেরা PFAS ধ্বংসকারী দুটি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মধ্যে একটি , যার নাম হাইড্রোডাইনামিক ক্যাভিটেশন, ইতিমধ্যে আশাব্যাঞ্জক ইঙ্গিত দিয়েছে।

হাইড্রোডাইনামিক ক্যাভিটেশন পদ্ধতিতে PFAS সম্বৃদ্ধ দূষিত জল একটি সংকীর্ণ প্রবাহপথের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয়। এর ফলে জলের ভেতরে অসংখ্য অতি সূক্ষ্ম বাষ্প বুদবুদ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ-শৃঙ্খলযুক্ত PFAS অণুগুলো সেসব বুদবুদের পৃষ্ঠে জমা হতে থাকে। জল সংকীর্ণ অংশ অতিক্রম করার পর চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পেলে বুদবুদগুলো হুড়মুড় করে ধসে পড়ে। সেই মুহূর্তে স্থানীয়ভাবে কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস সমতুল্য তাপমাত্রা সৃষ্টি হয়। PFAS-এর অত্যন্ত স্থিতিশীল রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে দেওয়ার জন্য তা প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে।

ক্যাভিটেশন প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হাইড্রক্সিল র‌্যাডিক্যাল/মূলক উৎপাদন। অত্যন্ত সক্রিয় এই অণুগুলো PFAS ভাঙনের সময় তৈরি হওয়া মধ্যবর্তী রাসায়নিক যৌগগুলোর সঙ্গে দ্রুত বিক্রিয়া করে। ফলে সেগুলো আরও ক্ষুদ্র উপাদানে পরিণত হয়। তখন PFAS ধীরে ধীরে তার স্থিতিশীল গঠন হারিয়ে কার্যকরভাবে অবক্ষয়ের পথে এগোয়।

২০২২ সালে শুরু হওয়া এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন পোস্টডক্টরাল গবেষক ড. ইসাবেল হুয়াকালো-আগুইলার। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত পরীক্ষায় কলের জলে উপস্থিত PFAS-এর ওপর প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। পরবর্তীতে Helmholtz Centre for Environmental Research (UFZ)-এর বিশ্লেষণে নিশ্চিত হয় যে, পরীক্ষার সময় PFAS অণুর অবক্ষয় ঘটছে এবং জলে ফ্লুরাইডের মাত্রা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ থেকে প্রমাণ হয় যে PFAS-এর মূল কাঠামো থেকে ফ্লুরিন সফলভাবে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে – যা কিনা এই রাসায়নিকের প্রকৃত ভাঙনের নির্দেশক।

গবেষণায় পারফ্লুরোঅকটেন সালফোনেট (PFOS)-এর ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। এটি PFAS পরিবারের সবচেয়ে স্থায়ী ও কঠিন যৌগগুলোর একটি। পরীক্ষার শেষে দেখা যায়, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রবীভূত PFOS-এর প্রায় ৩৭ শতাংশ অবক্ষয় সম্ভব হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে অবক্ষয়ের হার স্থিতিশীল ছিল।

গবেষকেরা মনে করছেন, এই ফলাফল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও তা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। বর্তমানে তারা প্রযুক্তিটির দক্ষতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে হাইড্রোডাইনামিক ক্যাভিটেশন ও কোল্ড প্লাজমা প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার শিল্পবর্জ্য ও পানীয় জলের উৎস থেকে অবিনশ্বর রাসয়নিকগুলিকে কার্যকরভাবে অপসারণের পথ খুলে দিতে পারে। সফল হলে এটি PFAS দূষণ নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এই কোল্ড প্লাজমা প্রযুক্তি নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব।

সূত্র: Scientists found two powerful new ways to destroy forever chemicals, A combination of collapsing bubbles and cold plasma could finally offer a way to destroy stubborn PFAS “forever chemicals” in water.July 19, 2026 Science Daily

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 11 =