অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার মুখোশ ছেঁড়া 

অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার মুখোশ ছেঁড়া 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে—আশা, ভয় ও অসহায়তাকে পুঁজি করে কিছু পদার্থ “অলৌকিক চিকিৎসা” হিসেবে বাজারজাত হয়েছে। মিরাকেল মিনারেল সলিউশন বা এম এম এস তেমনই এক উদাহরণ। ক্যান্সার, অটিজম, কোভিড-১৯ থেকে শুরু করে স্থূলতা, প্রায় সবকিছুর প্রতিষেধক হিসেবে এম এম এস-কে উপস্থাপন করা হলেও, পোল্যান্ডের রোক্ল মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক গবেষণা এই দাবিগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেছে।

বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন- এম এম এস কোনো চিকিৎসা নয়; এটি মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইট (NaClO₂)—একটি শক্তিশালী জীবাণুনাশক রাসায়নিক, যা সাধারণত জল পরিশোধন ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। অ্যাসিডের সঙ্গে মিশলে এটি তৈরি করে ক্লোরিন ডাই-অক্সাইড (ClO₂), যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ।

গবেষকরা অম্লীকৃত সোডিয়াম ক্লোরাইটের দুটি সংস্করণ পরীক্ষা করেন। একটি হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও অন্যটি গ্লুকোনিক অ্যাসিড দিয়ে প্রস্তুত। এই রাসায়নিকগুলো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া (যেমন- ই.কোলাই, স্টাফিলোকক্কাস অরিয়াস) এবং উপকারী প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া (ল্যাক্টোব্যাসিলাস র‍্যামনোসাস)—উভয়ের ওপরই প্রয়োগ করা হয়।

গবেষণার ফল বিশেষ আশাব্যঞ্জক ছিল না। সত্যি বলতে, ক্লোরিন ডাই-অক্সাইড ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু এমন নির্দিষ্ট মাত্রায়, যা একই সঙ্গে মানুষের ত্বক ও কোষের জন্য ক্ষতিকর।

মাত্র ৩০ ppm ঘনত্বেই ব্যাকটেরিয়া নিধন সম্ভব হলেও, সেই স্তরেই ত্বককোষের ক্ষতি ও উচ্চ মাত্রায় কোষ-মৃত্যু লক্ষ্য করা যায়। এমনকি ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরক্ষামূলক গঠন বায়োফিল্ম ভাঙতে গিয়েও আশপাশের সুস্থ কোষকলা আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ, যেখানে কার্যকারিতার শুরু, সেখানেই অনিবার্য বিষক্রিয়া।

আরও বিপজ্জনক দিক হলো, এম এম এস উপকারী অন্ত্রজীবাণুকেও ধ্বংস করে, যেগুলো হয়তো মানুষের বিপাক, রোগপ্রতিরোধ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘরে তৈরি এম এম এস মিশ্রণগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সেখানে ডোজের কোনো মানদণ্ড থাকে না। ড্রপারে “১৫ ফোঁটা না ৩০ ফোঁটা”—এই পার্থক্যই একটি ক্ষয়কারী রাসায়নিকের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। একটি ক্ষয়কারী রাসায়নিকের ক্ষেত্রে এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত মাত্রা প্রয়োগ বৈজ্ঞানিকভাবে যেমন অগ্রাহ্য, তেমনি নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ।

গবেষকরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন—এম এম এস -এর ক্ষেত্রে লাভ খুব একটা হয় না, কিন্তু ঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি। তবু ভয়, হতাশা ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে এটি শিশু, গর্ভবতী নারী এমনকি ওজন কমানোর নামেও প্রচার করা হচ্ছে। যা কেবল ভ্রান্ত চিকিৎসাই নয় বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়ও বটে।

গবেষকরা মনে করেন, এই ধরনের দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অতথ্যের ধারাপাত ভাঙতে হলে কেবল কঠোর ভাষা নয়, বরং সহানুভূতি, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও আন্তঃবিভাগীয় প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মানুষের অসুস্থতা ও আশঙ্কাকে সম্মান জানিয়েই ভুল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এই গবেষণা আমাদের আরো একবার জ্ঞানচক্ষু উন্মোচন করলো যে, সব “মিরাকেল কিওর” আসলে আশার আলো নয়; কিছু কিছু কেবল বিষ, ভুল তথ্য আর বিপদের আরেক নামও হতে পারে।

 

সূত্র: Antimicrobial properties and toxicity challenges of chlorine dioxide used in alternative medicine by Ruth Dudek-Wicher, Malwina Brożyna, Materials provided by Wroclaw Medical University, published in Scientific Reports, 2025; 15 (1) DOI: 10.1038/s41598-025-01852-z

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + 8 =