অ্যান্টার্কটিকার পূর্বাঞ্চলে সম্প্রতি একটি বিস্ময়কর উপগ্রহ চিত্র বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রথম দেখায় ছবিটি যেন বরফে গড়া একটি হামিংবার্ড পাখির আকৃতি বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো পাখি নয়; এটি একটি বিশাল হিমবাহ। কীভাবে তা একটি পর্বতকে ঘিরে অত্যন্ত ধীরগতিতে প্রবাহিত হচ্ছে, তারই অসাধারণ রেডারচিত্র। এই অনন্য দৃশ্য ধারণ করেছে নাসা এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)-এর যৌথ উদ্যোগে নির্মিত NISAR (NASA-ISRO Synthetic Aperture Radar) উপগ্রহ।
NISAR বিশ্বের প্রথম উপগ্রহ, যেখানে দুটি ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার (SAR)—L-band এবং S-band—একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের L-band বরফের গভীরে প্রবেশ করে অভ্যন্তরীণ গঠন বিশ্লেষণ করতে পারে, আর ছোট S-band পৃষ্ঠের সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ফলে হিমবাহ, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, বনভূমি ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
ছবির সবুজ, ম্যাজেন্টা ও সাদা রংগুলি বরফের প্রকৃত রং নয়; এগুলো রেডার সংকেতের পোলারাইজেশন বা প্রতিফলনের দিক নির্দেশক। ম্যাজেন্টা অংশটি মসৃণ বরফের পৃষ্ঠ থেকে ফিরে আসা অনুভূমিক সংকেতকে নির্দেশ করে, সবুজ অংশ গভীরের অসমান স্তর ও ফাটল থেকে প্রতিফলিত উল্লম্ব সংকেতকে বোঝায়, আর সাদা অংশে দেখা যায় এই দুই ধরনের সংকেতের সমন্বয়। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বরফের নীচে লুকিয়ে থাকা ফাটল, অভ্যন্তরীণ গঠন এবং প্রবাহের প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছেন।
ছবির তথাকথিত ‘হামিংবার্ড’ আকৃতি তৈরি হওয়ার কারণ আছে। হিমবাহটি নুনাটাক জাটেরিয়াভশিজসজা নামের একটি উঁচু পাথুরে পর্বতকে ঘিরে প্রবাহিত হওয়ার সময় বরফে ফাটল ও বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। অনেকটা নদীর জল যেমন বড় পাথর ঘুরে প্রবাহিত হয়, তেমনি বরফও অত্যন্ত ধীরগতিতে পর্বতের চারপাশ দিয়ে বয়ে যায়। অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডে এ ধরনের নুনাটাক সাধারণভাবে দেখা যায়, যা বরফের সাগরের মাঝখানে স্থির পাথুরে দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
একই স্থানের সাধারণ অপটিক্যাল উপগ্রহ চিত্র প্রায় সম্পূর্ণ সাদা দেখায়। বরফের নীচের গঠন সম্পর্কে তা খুব কম তথ্য দেয়। কিন্তু NISAR-এর এই রেডার প্রযুক্তি বরফ ও তুষারের গভীরে প্রবেশ করতে পারে, ফলে চোখে অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। নাসার গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহ কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরফের আচরণ কীভাবে বদলাচ্ছে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও পথ দেখাবে।
প্রায় এক বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে NISAR। প্রতিদিন কয়েক ডজন টেরাবাইট তথ্য সংগ্রহ করছে এবং প্রতি ১২ দিনে পৃথিবীর পুরো পৃষ্ঠকে দুইবার স্ক্যান করতে পারছে। হিমবাহ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিধস, বনাঞ্চলের পরিবর্তন এবং পরিবেশগত রূপান্তরের ওপরেও নজরদারি করবে। বিজ্ঞানীদের আশা, আগামী বছরগুলোতে NISAR পৃথিবীর এমন আরও অসংখ্য বিস্ময়কর দৃশ্য ও লুকিয়ে থাকা ভূ-প্রাকৃতিক রহস্য উন্মোচন করবে, যা প্রচলিত অপটিক্যাল উপগ্রহর মাধ্যমে দেখা সম্ভব নয়।
সূত্র: Experts can now get a better look under the surface of vast glaciers
By David Nield, 10:54 AM GMT-5 on July 27, 2026
