আর্কিমিডিসের বিখ্যাত উক্তি একটু পাল্টে দিয়ে বলা যায়, যদি যথেষ্ট লম্বা একটি সেলফি স্টিক থাকত, তাহলে আমরা হয়তো পুরো ছায়াপথের ছবি তুলতে পারতাম। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ভরসা রাখেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপগুলোর একটির উপর। চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত আতাকামা লার্জ মিলিমিটার/সাবমিলিমিটার অ্যারে- ALMA। সম্প্রতি অ্যালমা ব্যবহার করে ইউরোপীয় সাদার্ন অবজারভেটরি (ESO)-র বিজ্ঞানীরা আকাশগঙ্গার একটি অভূতপূর্ব বড় ছবি প্রকাশ করেছেন। এটি এখনও পর্যন্ত আমাদের ছায়াপথের সবচেয়ে বিস্তৃত ও বিস্তারিত রেডিও-চিত্রগুলোর মধ্যে একটি। প্রায় ৬৫০ আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত এই মানচিত্রটি তৈরি হয়েছে অসংখ্য পৃথক পৃথক পর্যবেক্ষণকে একত্র করে- যেন এক বিশাল মহাজাগতিক মোজাইক। ছবিটি আকাশে পাশাপাশি রাখা তিনটি পূর্ণচাঁদের সমান এলাকা জুড়ে ব্যাপ্ত। কিন্তু আকারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, এর লক্ষ্যস্থল : আকাশগঙ্গার কেন্দ্রস্থলের কাছের “সেন্ট্রাল মলিকিউলার জোন”। এই অঞ্চলটি ঘন গ্যাস ও ধূলিতে আচ্ছাদিত, যা প্রায় অদৃশ্য। অ্যালমা মিলিমিটার ও সাবমিলিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কাজ করে সেই পর্দা ভেদ করেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এটি হলো “চরমতার অঞ্চল”। এখানে গ্যাসের ঘনত্ব আকাশগঙ্গার বাইরের অংশের তুলনায় বহু গুণ বেশি। তাপমাত্রা, চাপ এবং অস্থিরতা, সবই স্বাভাবিকের চেয়ে তীব্র। এই পরিবেশেই জন্ম নেয় গ্যালাক্সির সবচেয়ে ভরবহুল নক্ষত্রগুলোর কয়েকটি। তারা দ্রুত জ্বলে ওঠে, অল্প সময়েই শেষ হয়, এবং সুপারনোভা বা কখনও আরও শক্তিশালী বিস্ফোরণে পরিণত হয়। ফলে অঞ্চলটি স্থিতিশীল নয়, ক্রমাগত আলোড়িত। নতুন এই সমীক্ষা শুধু নক্ষত্র-গঠন নয়, অঞ্চলটির রসায়নও উন্মোচন করেছে। অ্যালমা সিলিকন মনোক্সাইডের মতো সরল অণু, পাশাপাশি মিথানল, অ্যাসিটোন ও ইথানলের মতো জটিল জৈব অণু শনাক্ত করেছে। এসব অণুর উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে নক্ষত্র জন্মের প্রক্রিয়া কেবল ভৌত নয়, গভীরভাবে রাসায়নিকও। গবেষকদের মতে, এই কেন্দ্রীয় অঞ্চলটিকে বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, অঞ্চলটি প্রাচীন মহাবিশ্বের নক্ষত্রপুঞ্জগুলির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। সেখানে নক্ষত্র গঠনের হার ছিল বেশি, পরিবেশ ছিল বিশৃঙ্খল। তাই ওই অঞ্চলকে অধ্যয়ন করা মানে অতীতের মহাবিশ্বে ফিরে যাওয়া। আলমা-র কাজ এখানেই থেমে থাকছে না। ২০০০-এর দশকের শুরুতে নির্মিত এই ব্যবস্থাটি এখন বড়সড় প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পথে। “অ্যালমা ওয়াইডব্যান্ড সংবেদনশীলতা উন্নয়ন প্রকল্প”-এর মাধ্যমে এর গ্রাহক যন্ত্র ও অবকাঠামো উন্নত করা হবে, ফলে আরও সংবেদনশীল ও বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি আরেকটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প হল, অত্যন্ত বৃহৎ অপটিক্যাল টেলিস্কোপ কার্যকর হলে অপটিক্যাল ও রেডিও তথ্য একত্র করে আরও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করা যাবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, উন্নত যন্ত্রপাতি দিয়ে এই কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সূক্ষ্মতর কাঠামো চিহ্নিত করা যাবে, জটিল অণুর সন্ধান বাড়বে, এবং নক্ষত্র, গ্যাস ও কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে। না, গ্যালাক্সির বাইরে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার উপায় নেই। কিন্তু আতাকামার অ্যান্টেনাগুলো প্রমাণ করছে, প্রযুক্তি ও কৌতূহলের সমন্বয়ে আমরা নিজেদের নক্ষত্রপুঞ্জের অন্দর মহলে নজর দিতে পারি। বৃহত্তম এই মানচিত্রটি সেই যাত্রাপথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, হয়তো আরও গভীরে যাওয়ার সূচনা।
সূত্র: Nautilus, March, 2026
