আটলান্টিক ব্যাপী ফাইবার-অপটিক ব্যবস্থা

আটলান্টিক ব্যাপী ফাইবার-অপটিক ব্যবস্থা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ মার্চ, ২০২৬

বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে TAT-8 এক যুগান্তকারী মাইলফলক। ১৯৮৮ সালে প্রবর্তিত এই কেবল-ই ছিল প্রথম ট্রান্সআটলান্টিক ফাইবার-অপটিক ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে সমুদ্রতলের নীচ দিয়ে একক-মোড কাচের ফাইবারের মাধ্যমে যুক্ত করেছিল। তামার তারনির্ভর পুরোনো টেলিফোন ব্যবস্থাকে বদলে ফেলে এটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগে গতি, সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে।

TAT-8 প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করে। এটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৮০ মেগাবিট হারে তথ্য পরিবহনে সক্ষম ছিল। সে সময়ের প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় এ হার অত্যন্ত অগ্রগণ্য। কেবল-এর ভেতরে ছিল একাধিক একক-মোড অপটিক্যাল ফাইবার, আর নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর অন্তর স্থাপন করা হয়েছিল অপ্টোইলেকট্রনিক রিপিটার। এই রিপিটারগুলো গভীর সমুদ্রের তীব্র চাপ সহ্য করার উপযোগী ইস্পাত-নির্মিত চাপ-সহ আচ্ছাদনে সুরক্ষিত ছিল। আলোক-সংকেতকে পুনরুজ্জীবিত করে এরা দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রমে সক্ষম ছিল। পরবর্তী সব দীর্ঘ-পাল্লার জলতলবর্তী কেবল-এর নকশা মূলত এই স্থাপত্য অনুসরণ করেই বিকশিত হয়েছিল।

প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি এই প্রকল্পকে প্রভাবিত করেছিল তৎকালীন নীতিগত ও বাজার-প্রতিযোগিতার চাপ। ১৯৭০–এর দশকে উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় মনে করা হচ্ছিল। ফলে জলতলবর্তী কেবল প্রযুক্তিকে টিকে থাকতে হলে তার কর্মদক্ষতা অনেক বাড়ানো অপরিহার্য ছিল। তামা-নির্ভর ব্যবস্থায় সংকেত ক্ষয় ও রিপিটার ব্যবধানের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়াই ছিল সময়ের দাবি।

পরীক্ষানিরীক্ষার পর্যায়ে কিছু কেবল-এ ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেলে হাঙরের আক্রমণ নিয়ে জনমানসে কৌতূহল তৈরি হয়। যদিও পরবর্তী নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় তড়িৎক্ষেত্রের কারণে হাঙর আকৃষ্ট হয়, এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি। তবুও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় কেবল-এর গঠনে একটি অতিরিক্ত ইস্পাত-স্তর যুক্ত করা হয়, যা যান্ত্রিক সুরক্ষা আরও জোরদার করে।

বর্তমানে এই ঐতিহাসিক কেবলটি সমুদ্রতল থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে বিশেষ ধরনের জাহাজ ও গ্র্যাপনেল (আঁকশি ) প্রযুক্তির মাধ্যমে। বিস্তারিত পথের নথিপত্র অনুসরণ করে ধীরগতিতে কেবল টেনে তোলা হয় এবং পরে তাকে পৃথক পৃথক উপাদানে বিচ্ছিন্ন করা হয়। উদ্ধার হওয়া তামা, ইস্পাত ও পলিমার আধুনিক পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। বিশেষত উচ্চমানের তামা শিল্পে পুনঃব্যবহারের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

ফাইবার-অপটিক অবকাঠামো আজও সারা বিশ্বে উপাত্ত পরিবহনের মূল ভিত্তি। উপগ্রহভিত্তিক ব্যবস্থার পরিপূরক ভূমিকা পালন করলেও ক্ষমতা, বিলম্ব ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়- সাশ্রয়ের নিরিখে সমুদ্রতলের ফাইবার কেবল-ই অগ্রগণ্য। TAT-8 কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক নয়; এটি বিশ্ব জুড়ে সংযোগের ইতিহাসে এক স্থায়ী ভিত্তি, যার প্রভাব আজও বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রতিফলিত।

 

সূত্র: The world’s first transatlantic fiber cable is being pulled off the ocean floor , Before Starlink, there was TAT-8, By Skye Jacobs, February 24, 2026 at 6:11 PM .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen + eleven =