আড়ি-পাতা ডলফিন

আড়ি-পাতা ডলফিন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আমরা যদি সমুদ্রকে ডলফিনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তবে সেখানে শব্দই তাদের যোগাযোগ,পথচলা এবং শিকার খোঁজার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। চোখের দৃষ্টির চেয়ে সেখানে শব্দের প্রতিধ্বনি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। এই শব্দ শিকার খোঁজা ও সমুদ্রের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতেও তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তারা একে অপরকে শনাক্ত করতে শিসের মতো শব্দ করে এবং প্রতিধ্বনির ভিত্তিতে দ্রুতগতির ইকোলোকেশন ক্লিক ব্যবহার করে জলের নীচের পরিবেশের গঠন বুঝে নেয় ও শিকার খুঁজে বের করে। কিন্তু বর্তমানে তেল উত্তোলন, জাহাজ চলাচল, বিস্ফোরণসহ নানা মানবসৃষ্ট শব্দ সমুদ্রকে ক্রমশ কোলাহলপূর্ণ করে তুলছে। এতে ডলফিনের স্বাভাবিক যোগাযোগ ও শিকার খোঁজার এই ক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে।

সম্প্রতি পিয়ার জে জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় আরও চমকপ্রদ একটি বিষয় উঠে এসেছে। ডলফিনরা সম্ভবত শব্দ উৎপাদনকারী মাছের ডাক আড়ি পেতে শুনে শিকার খুঁজে নেয়। বিশেষ করে ড্রাম বা ক্রোকারজাতীয় মাছ (Sciaenidae) তাদের সাঁতারথলির কম্পনের মাধ্যমে বিশেষ ধরনের ডাক তৈরি করে। গবেষকদের ধারণা, ডলফিনরা সেই শব্দ শনাক্ত করে সম্ভাব্য শিকারের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পায়।

ফ্লোরিডা আটলান্টিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হারবার ব্রাঞ্চ ওশেনোগ্রাফিক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ফ্লোরিডার আটলান্টিক উপকূলের ফোর্ট পিয়ার্স থেকে জ্যাকসনভিল পর্যন্ত প্রায় দুই মাস ডলফিনের শব্দ পর্যবেক্ষণ করেন। একটি ওয়েভ গ্লাইডার-এর সঙ্গে যুক্ত করে জলের নীচে প্রায় ৪ থেকে ১০ মিটার গভীরে রেকর্ডিং যন্ত্রও বসানো হয়। একই সঙ্গে এর সাহায্যে সমুদ্রস্রোত, গভীরতা, তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন ভৌত বৈশিষ্ট্যও মাপা হয়।

গবেষকেরা মোট ৬২ ঘণ্টার সমুদ্র-শব্দ বিশ্লেষণ করেন। প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর ১৫ সেকেন্ড ধরে রেকর্ড করা শব্দে প্রায় ১,৭০০ বার ডলফিনের শিস, ইকোলোকেশন ক্লিক অথবা দু-ধরনের শব্দই শনাক্ত হয়। এসব শব্দকে সমুদ্রের পরিবেশ ও অন্যান্য প্রাণীর শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করে ডলফিনের আচরণ সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যায়।

দেখা যায়, উপকূলের কাছাকাছি ডলফিনরা বেশি শিস দেয়। জলের তাপমাত্রা ও ক্লোরোফিলের ঘনত্ব প্রভৃতি পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গেও তাদের শিস দেওয়ার প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে। ডলফিনের শিস বেশ অনেকটা দূরে পৌঁছাতে পারে – প্রায় ১২ মাইল বা তারও বেশি। তাই দলবদ্ধ ডলফিনদের পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ ও অবস্থান বজায় রাখতে এই শব্দ গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, ইকোলোকেশন ক্লিকের ব্যবহার বিশেষভাবে দুটি এলাকায় বেশি দেখা যায়। যেখানে ক্রোকার, টোডফিশ ও ক্যারাংগিডসহ বিভিন্ন শব্দ উৎপাদনকারী মাছের সংখ্যা প্রচুর। এর থেকেই গবেষকেরা মনে করছেন, ডলফিন শুধু চোখ বা ইকোলোকেশন দিয়ে নয়, শব্দ শুনেও শিকারের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে।

মোদ্দাকথা, সামুদ্রিক শব্দের জগৎ ডলফিনের কাছে যেন একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডার। সেখানে সবাই সবার কথা আড়ি পেতে শুনছে। ডলফিনের সামাজিক জীবন ও খাদ্য অনুসন্ধানের জন্য ব্যবহৃত শব্দের এই পার্থক্য বোঝার কৌশলটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ এক কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে কোন সমুদ্রাঞ্চল ডলফিনের জন্য শব্দগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তা শনাক্ত করে সেই এলাকাগুলোকে জাহাজ, তেল উত্তোলন ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট শব্দদূষণ থেকে সুরক্ষিত করার পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

সূত্র: https://nautil.us/dolphins-eavesdrop-on-their-prey-and-each-other 1284095?giftLink=703c0a1256f6b665088e8fcdc5df63e9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − four =