আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করা যায়। সম্ভব হয়, অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে শরীরের ভেতরের ছবি তোলা। তবুও সঠিক রোগ নির্ধারণ করা যায় না অনেক সময়ই। অর্থাৎ চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক কাজগুলোর একটি যা কিনা “রোগের সঠিক নাম নির্ধারণ’’- তা প্রায়ই ব্যর্থ হয়। একজন নয় কিছুজন নয়, রয়েছে এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ। এই জটিল বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে, সাংবাদিক অ্যালেক্সান্দ্রা সিফারলিন-এর বই ‘দ্য এলিউসিভ বডি’-তে তুলে ধরেছেন এমন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থেকেও নির্দিষ্ট কোনো রোগনির্ণয় পায় না। সাত বছরের দীর্ঘ অনুসন্ধানমূলক কাজের ভিত্তিতে সিফারলিন বিশ্লেষণ করেছেন সেইসব কাঠামোগত, প্রযুক্তিগত এবং মানবিক কারণ যা যৌথভাবে তৈরি করেছে তথাকথিত “রোগনির্ণয় সংকট’’। সিফারলিনের লেখা, এই বইটির অন্যতম শক্তি, জটিল বৈজ্ঞানিক বিষয়কে সহজ ও বোধগম্যভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতা। জিনের প্রকারভেদ, বিরল রোগ, কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মধ্যে রেফারাল প্রক্রিয়ার মতো বিষয়গুলোকে গল্পের আকারে তুলে ধরেছেন তিনি, যাতে পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন।
তবে শুধুই বিজ্ঞান নয়, এই বইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের গল্প এবং তাদের মানসিক সংগ্রাম। যেমন প্রোক্টর পরিবারের কথা। যাদের শরীরে এক বিরল জেনেটিক পরিবর্তন ধীরে ধীরে পেশি শক্ত করে “সিমেন্টের মতো’’ করে তোলে। আবার আছে ৩০ বছর বয়সী মার্ক হুপার্ট। হুপার্ট একসময় সাইক্লিস্ট ও বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন। অথচ এখন ভারসাম্যহীনতার কারণে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতেও পারেন না। এই ধরনের বিরল রোগের সঙ্গে অধিকাংশ পাঠকের সরাসরি পরিচয় না থাকলেও, অজানা উপসর্গ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগার হতাশা অনেকেই অনুভব করবেন, নিশ্চিত।
বইটি শুধুমাত্র রোগীদের দুঃখ-কষ্টই তুলে ধরে না, বরং চিকিৎসকদের অবস্থানকেও সহানুভূতির সঙ্গে ব্যাখ্যা করে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করেন, যেখানে সময়ের অভাব, অতিরিক্ত চাপ এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তাঁদের কাজকে কঠিন করে তোলে। উদাহরণ হিসাবে তিনি টেনেছেন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের ‘অজ্ঞাত রোগ নির্ণয় নেটওয়ার্ক’-এর কথা। এ এমন এক উদ্যোগ, যেখানে চিকিৎসক ও গবেষকরা একত্রে কাজ করেন। তাঁরা একত্রেই অত্যন্ত জটিল এবং অজানা রোগের সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন। এই “শেষ আশ্রয়” ধরনের ক্লিনিকগুলো দেখায়, রোগ নির্ণয় আসলে এক যৌথ প্রচেষ্টা এবং সর্বোপরি খুব সোজা বিষয় নয়। শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডায়ানা সেহাস নিজেই ডাক্তারি পড়ার সময় গলায় একটি গাঁট লক্ষ্য করেছিলেন, কিন্তু তাঁর উদ্বেগ বারবার উপেক্ষিত হয়। পরে হাউস স্টাফ পর্বের দ্বিতীয় বছরে তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়ে। জরুরি অস্ত্রোপচারের পর তিনি স্ট্রোকের শিকার হন, যার ফলে আংশিক পক্ষাঘাত এবং কথাবার্তায় সমস্যা তৈরি হয়।
ডায়ানা একাধারে একজন চিকিৎসক এবং একজন রোগী। এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, কীভাবে মুনাফাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রোগীর কথা মন দিয়ে শোনার বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। চিকিৎসা ব্যবস্থায় “বেডসাইড ডায়াগনোসিস’’ বা রোগশয্যায় রোগীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লিসা স্যান্ডার্সের ভাষায়,“এখন রোগ নির্ণয়ের সময় কমে এসেছে। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে চিকিৎসা অনেকটাই যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠেছে, যেখানে অ্যালগরিদম ও ডেটা বিশ্লেষণ বড় ভূমিকা নিচ্ছে’’।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দ্রুত প্রসারমান প্রভাব বইটিতে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে। অথচ বর্তমান সময়ে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এআই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। লেখিকা বইয়ের শেষের দিকে বিষয়টির উল্লেখ করেছেন বটে, তবে শুরুতেই এই পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তুলে ধরলে হয়তো বিশ্লেষণটি আরও শক্তিশালী হতে পারত। বইটির আরেকটি সূক্ষ্ম সীমাবদ্ধতা হল, লেখিকা তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা বা ব্যক্তিগত ভাবনাচিন্তা খুব কমই সামনে এনেছেন। সে বিষয়ে অতুল গাওয়ান্ডে-র ‘বিইং মর্টাল’ এবং এলিজাবেথ রোজেনথাল-এর ‘অ্যান আমেরিকান সিকনেস’- এই বইগুলোতে তুলনামূলকভাবে, লেখকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি পাঠকের সঙ্গে একটি গভীর সংযোগ তৈরি করে। সিফারলিনের সংযত উপস্থাপন কিছু পাঠকের কাছে পছন্দের হলেও, অন্যদের কাছে এটাই কিছুটা দূরত্ব তৈরি করতে পারে। তবে তাতে যে বইটির সামগ্রিক গুরুত্ব কমে যায়, তেমনটা নয়।
বরং ‘দ্য এলিউসিভ বডি’-র মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, রোগনির্ণয় কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়। এ এক সমন্বিত প্রক্রিয়া, যেখানে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিভিন্ন শাখার মধ্যে সহযোগিতা এবং রোগীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া। ভুল রোগনির্ণয় বা দেরি করে চিকিৎসা মানুষের জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলে। শারীরিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সব দিক থেকেই। বিষয়টি সহজেই জন্ম দিতে পারে হতাশার। পরিসংখ্যান বলছে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র স্বাস্থ্যখাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারে না।
তবে বইটি পুরোপুরি হতাশার বার্তা দেয় না। বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সামনে আনে। যদি রোগ নির্ণয়ের ব্যর্থতা একটি কাঠামোগত সমস্যা হয়, তাহলে এর সমাধানও কাঠামোগতভাবেই সম্ভব। অর্থাৎ, সঠিক নীতি, উন্নত সমন্বয় এবং রোগীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে পরিস্থিতির উন্নতি করা যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে চিকিৎসাবিজ্ঞান যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের অভিজ্ঞতা, তার কথা এবং তার কষ্টকে বোঝার কোনো বিকল্প নেই। আর সেই বোঝাপড়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সত্যিকারের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার এক সম্ভাবনা।
সূত্র: Science
