আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে আঁরি পোঁয়াকারের বিপুল অবদান

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে আঁরি পোঁয়াকারের বিপুল অবদান

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশিষ্ট গণিতবিদ ও পদার্থবিদ আঁরি পোঁয়াকারে (Henri Poincare, 1854-1912) শেষ সর্বজনীনতাবাদী নামেই বিশেষভাবে খ্যাত। ইনি এমনই একজন বিজ্ঞানী, যিনি একই সঙ্গে গণিত, পদার্থবিদ্যা ও বিজ্ঞানের দর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। গণিতে তাঁর অবদান অসাধারণ হলেও, আধুনিক পদার্থবিদ্যার বিকাশেও তাঁর ভূমিকা কিছু কম ছিল না। বিশেষ করে স্থান, কাল, আলো এবং গতির সম্পর্ক নিয়ে তাঁর কাজ পরবর্তীকালে বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

আইনস্টাইনের ১৯০৫ সালের বিখ্যাত গবেষণাপত্র প্রকাশের কয়েক বছর আগেই পোঁয়াকারে স্থান ও কালের মৌলিক ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ১৮৯৮ সালে লেখা তাঁর প্রবন্ধ La Mesure du Temps বা ‘সময়ের পরিমাপ’-এ তিনি দেখান, দূরে অবস্থিত দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটছে কি না, তা আমরা সরাসরি অনুভব করতে পারি না। অর্থাৎ, দূরের দুটি ঘটনার একই সময় কোনো স্বতঃসিদ্ধ বিষয় নয়। ঘড়ি, আলোর সংকেত এবং নির্দিষ্ট পরিমাপ-পদ্ধতির সাহায্যে আমাদের তা নির্ধারণ করতে হয়।

১৯০০ সালে পোঁয়াকারে আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। ডাচ পদার্থবিদ হেনড্রিক লরেঞ্জের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি স্থানীয় সময়কে শুধু গণিতের একটি কৌশল হিসেবে দেখেননি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, পৃথিবীর সঙ্গে গতিশীল পর্যবেক্ষকেরা আলোর সংকেত ব্যবহার করে ঘড়ি সমন্বয় করতে পারেন এবং সেই ঘড়িতে যে সময় পাওয়া যাবে, তা লরেঞ্জের স্থানীয় সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে স্থানীয় সময় একটি বাস্তব পরিমাপযোগ্য অর্থ পায়। তবে তখনও পোঁয়াকারে লরেঞ্জের ইথার-ভিত্তিক ধারণার কাঠামোর মধ্যেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করছিলেন এবং তাঁর বিশ্লেষণ ছিল প্রথম ক্রমিক মাত্রায়ই সীমাবদ্ধ।

১৯০৪ সালে সেন্ট লুইসে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের এক বিখ্যাত বক্তৃতায় পোঁয়াকারে আরও স্পষ্টভাবে আপেক্ষিকতার নীতি তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেন, কোনো পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষার মাধ্যমে সমবেগে চলমান অবস্থাকে একটি পরম স্থির অবস্থার তুলনায় শনাক্ত করা সম্ভব হওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ, প্রকৃতির মৌলিক নিয়মগুলো পর্যবেক্ষকের সমবেগের ওপর নির্ভর করবে না। ধীরে ধীরে তিনি এই ধারণাকে প্রকৃতির একটি মৌলিক নীতি হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

এরপর ১৯০৫ সালের ৫ জুন পোঁয়াকারে ফরাসি বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিতে তাঁর Sur la dynamique de l’électron বা ‘ইলেকট্রনের গতিবিদ্যা’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে আইনস্টাইনের বিখ্যাত প্রবন্ধ On the Electrodynamics of Moving Bodies ৩০ জুন ১৯০৫-এ Annalen der Physik-এ জমা পড়ে।

পোঁয়াকারের ১৯০৫ সালের ওই কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল লরেঞ্জ রূপান্তরকে সরাসরি নাম দেওয়া এবং তার গাণিতিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা। তিনি দেখান, এই রূপান্তরগুলো স্থানিক ঘূর্ণনের সঙ্গে মিলিয়ে একটি গ্রুপ বা গোষ্ঠী গঠন করে। পরে স্থান-কালগত সরণ -কে এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে যে গাণিতিক সামঞ্জস্য তৈরি হয়, সেটি পরিচিত হয় পোঁয়াকারে গ্রুপ নামে। আধুনিক পদার্থবিদ্যা, বিশেষ করে আপেক্ষিকতাবাদী ক্ষেত্রতত্ত্বে এই গোষ্ঠীর গুরুত্ব অপরিসীম।

তবে পোঁয়াকারে ও আইনস্টাইনের মধ্যে মূল পার্থক্য ছিল ধারণাগত বা দার্শনিক ব্যাখ্যায়। পোয়াকারে তখনও লরেঞ্জের ইথার-ভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করছিলেন। তাঁর কাছে স্থানীয় সময় ও দৈর্ঘ্য-সংকোচন ছিল গতিশীল বস্তুর ওপর ইথারের প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে আইনস্টাইন কোনো বিশেষ ইথার কাঠামোর প্রয়োজন স্বীকার করেননি। তিনি আপেক্ষিকতার নীতি এবং আলোর বেগের ধ্রুবতাকে ভিত্তি করে স্থান ও সময়ের নতুন ধারণা নির্মাণ করেন। বিশেষ করে দূরবর্তী ঘটনাগুলোর একসঙ্গে ঘটার ধারণা অর্থাৎ আপেক্ষিক একযোগের ভূমিকা আইনস্টাইনের তত্ত্বে কেন্দ্রীয়।

এই কারণেই ইতিহাসবিদদের কাছে ভূমিকা ও আইনস্টাইনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। পোঁয়াকারে আপেক্ষিকতার বহু গাণিতিক ও ভৌত কাঠামো আগে থেকেই বিকশিত করেছিলেন; কিন্তু আইনস্টাইন সেই ধারণাগুলোকে একটি নতুন ও সুসংহত ধারণাগত কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেন। তাই বিশেষ আপেক্ষিকতার কৃতিত্ব কার? এই প্রশ্নের উত্তর একেবারে সরল নয় এবং বিষয়টি এখনও ঐতিহাসিক বিতর্কের অংশ।

পোঁয়াকারের গবেষণা অবশ্য আপেক্ষিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি তড়িৎচুম্বকত্ব, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ এবং আলোকবিজ্ঞান নিয়েও ব্যাপক কাজ করেছিলেন। ১৯১১ সালের সলভে কংগ্রেসের পর তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বের সমস্যার দিকেও মন দেন। ১৯১১-র ৪ঠা ডিসেম্বর তিনি ফরাসি বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিতে Sur la théorie des quanta বা ‘ কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রসঙ্গে ‘ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পরের জানুয়ারিতে এর বিস্তৃত সংস্করণ প্রকাশিত হয় Journal de Physique-এ।

এই গবেষণায় পোঁয়াকারে দেখান, প্ল্যাঙ্কের বিকিরণ সূত্রকে সম্পূর্ণ ধারাবাহিক শক্তি-বিনিময়ের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায় না। অর্থাৎ, শক্তির আদান-প্রদানে কোনো না কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতা মেনে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কোয়ান্টাম তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও পরবর্তী বিকাশে এই যুক্তির উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে। ব্রিটিশ পদার্থবিদ জেমস জিন্সের বিকিরণ-সংক্রান্ত পরবর্তী কাজও পোঁয়াকারের এই যুক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।

গণিত ও পদার্থবিদ্যার নানা শাখায় তাঁর বহুমুখী কাজ আধুনিক গাণিতিক পদার্থবিদ্যার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুঃখের বিষয়, কোয়ান্টাম বিকিরণ নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাত্র কয়েক মাস পরই, ১৯১২ সালের জুলাইয়ে, পোঁয়াকারের মৃত্যু হয়।

তাই পোঁয়াকারেকে শুধু আইনস্টাইনের আগে আপেক্ষিকতার ধারণা দেওয়া বিজ্ঞানী হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানের ব্যাপ্তি ছোট করে দেখা হয়। স্থান-কাল, আপেক্ষিকতা, তড়িৎচুম্বকত্ব, কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং গাণিতিক সামঞ্জস্য- বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা আধুনিক পদার্থবিদ্যার ভিত গঠনে অনস্বীকার্য।

 

সূত্র: https://comptes-rendus.academie sciences.fr/physique/item/10.1016/j.crhy.2017.10.006.pdf

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − 12 =