১৯১৯ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। শুরু হল বিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দেওয়া এক অভিযান। ব্রিটিশদের দুটি দল পাড়ি দিল পৃথিবীর দুই প্রান্তে – ব্রাজিলের সোব্রাল এবং আফ্রিকার ছোট দ্বীপ প্রিন্সিপি-তে। লক্ষ্য, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের মহাকর্ষ আলোকে কতটা বাঁকিয়ে দেয়, তা মাপা। কারণ, ১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ অনুযায়ী সূর্যের মতো বিশাল বস্তুর মহাকর্ষ তার পাশ দিয়ে যাওয়া আলোকরশ্মির পথও বাঁকিয়ে দিতে পারে। ১৯১৯-এর পূর্ণ গ্রহণ ছিল সেই ভবিষ্যদ্বাণী পরীক্ষার বড় সুযোগ। সোব্রাল অভিযানে ছিলেন গ্রিনিচ অবজারভেটরির দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী চার্লস রান্ডল ডেভিডসন ও অ্যান্ড্রু ক্রমেলিন। আর প্রিন্সিপিতে যান খ্যাতনামা জ্যোতিঃপদার্থবিদ আর্থার এডিংটন। সঙ্গে ছিলেন অনেক কম পরিচিত এক ব্যক্তি, এডউইন টার্নার কটিংহ্যাম। ইতিহাসে কটিংহ্যামের পরিচয় স্রেফ ‘ঘড়িওয়ালা’ হিসেবেই। কিন্তু তিনি মোটেই এক সাধারণ ঘড়ি মেরামতকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিখুঁত সময় মাপার যন্ত্রের বিশেষজ্ঞ, যে দক্ষতা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের সাফল্যের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিংশ শতকের গোড়ায় রেডিও, টেলিগ্রাফ ও বিদ্যুতের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নির্ভুল সময় মাপার প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছিল। কটিংহ্যাম সেই সময়েই ঘড়ির যন্ত্রকৌশলে দক্ষতা অর্জন করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯১৯-এর অভিযানের প্রস্তুতিতে তিনি সূর্যের ছবি স্থিরভাবে ধরার বিশেষ যন্ত্র ১৬ ইঞ্চি কোয়েলোস্ট্যাট পরীক্ষা ও মেরামতের কাজে যুক্ত ছিলেন। পরে সেই দক্ষতার কারণেই তাঁকে এডিংটনের সঙ্গে প্রিন্সিপি অভিযানে নেওয়া হয়। গ্রহণের কয়েক মিনিটের পর্যবেক্ষণে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সূর্যের চারপাশে তারার অবস্থান নথিবদ্ধ করে পরে হিসাব করা হবে, আলো সত্যিই সূর্যের মহাকর্ষে বেঁকেছে কি না। সেখানে সামান্য যান্ত্রিক বা সময়গত ভুলও পুরো ফলাফলকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারত।
ইতিহাসের জনপ্রিয় কাহিনিতে কটিংহ্যাম প্রায় হারিয়েই গিয়েছেন। আইনস্টাইন, এডিংটন এবং ‘আপেক্ষিকতার জয়’-এর আলোয় তাঁর দীর্ঘ পেশাগত জীবন ঢাকা পড়েছে। এখানেই লুকিয়ে ইতিহাসের এক বড় শিক্ষা, বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার শুধু তত্ত্ব আর বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের কৃতিত্বে তৈরি হয় না। তার পিছনে থাকে যন্ত্র বানানো, সময় মাপা, সূক্ষ্ম হিসাব করা এবং অসংখ্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা। ১৯১৯-এর সূর্যগ্রহণ সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সেখানে আইনস্টাইনের তত্ত্বকে আকাশে পরীক্ষা করতে এডিংটনের পাশে প্রয়োজন হয়েছিল এক ‘সময়-কারিগর’ কটিংহ্যামকে।
সূত্রঃ The Royal Society Publishing; 2026.
