১৯২৬ সাল। অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের ছোট্ট শহর ঝাং। সেখানেই আজ থেকে একশো বছর আগে জন্ম আবদুস সালামের। বর্তমানে জায়গাটি পাকিস্তানের অংশ। তাঁর পরিবারটি ছিল ধর্মবিশ্বাসী এবং শিক্ষার প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী। বাবা ছিলেন দরিদ্র কৃষিপ্রধান একটি এলাকার শিক্ষা দফতরের কর্মী। মাত্র ১৪ বছর বয়সে সালাম এমন কৃতিত্ব দেখান, যা গোটা শহরকে তাক লাগিয়ে দেয়। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি রেকর্ড করা সর্বোচ্চ নম্বর পান। লাহোর থেকে সাইকেলে বাড়ি ফেরার সময় তাঁকে স্বাগত জানাতে রাস্তায় নামে গোটা শহর। এরপর শুরু হয় তাঁর দ্রুত এগিয়ে চলা। বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট কলেজে। সেখানে তাঁর অঙ্কের মাস্টারমশাই ছিলেন কলকাতার মানুষ অনিলেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। ১৯৪৬ সালে এমএ শেষ করে সেই আরেকটি বৃত্তি নিয়ে পাড়ি দেন ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জনস কলেজে। ১৯৪৯ সালে গণিত ও পদার্থবিদ্যায় অসাধারণ ফল করে অর্জন করেন ডাবল ফার্স্ট।
পরের বছরই ডক্টরেটের আগের পর্যায়ে পদার্থবিদ্যায় অসাধারণ গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ পান কেমব্রিজের স্মিথস প্রাইজ। এরপর তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় পিএইচ ডি করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স, যা তাঁকে খুব অল্প বয়সেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে পরিচিত করে তোলে।
১৯৫১ সালে সালাম পাকিস্তানে ফিরে লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজে গণিত পড়াতে শুরু করেন। পরের বছর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্রধান হন। তাঁর স্বপ্ন ছিল দেশে একটি শক্তিশালী গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলা। কিন্তু তখন পাকিস্তানে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় উচ্চমানের গবেষণার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো প্রায় ছিল না। তাছাড়া দেশের সরকারও সে ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। মনে অনেক দুঃখ নিয়ে শেষ পর্যন্ত গবেষণা চালিয়ে যেতে তাঁকে বিদেশে ফিরে যেতে হয়। এই অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর জীবনের অন্যতম বড় কাজের ভিত্তি তৈরি করে। তিনি বুঝেছিলেন, উন্নয়নশীল দেশের মেধাবী তরুণ বিজ্ঞানীরা শুধু অর্থের অভাবে নয়, ভালো গবেষণার পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অভাবেও পিছিয়ে পড়েন। তা সত্ত্বেও কিন্তু নিজের দেশের সঙ্গে যোগাযোগ কখনও ছিন্ন করেননি। পাকিস্তানের বিজ্ঞাননীতির পরামর্শদাতা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন পাকিস্তান অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের সদস্য, সায়েন্টিফিক কমিশনের সদস্য এবং ১৯৬১ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা।
গরিব দেশের বিজ্ঞানীদের এই সমস্যার সমাধানেই তিনি ইতালির ত্রিয়েস্তেতে গড়ে তোলেন আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা কেন্দ্র (আইসিটিপি)। এই প্রতিষ্ঠান পরবর্তীকালে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির তরুণ পদার্থবিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকেন্দ্র হয়ে ওঠে। সেখানে চালু হয় বিখ্যাত অ্যাসোসিয়েটশিপ কর্মসূচি। এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশের তরুণ বিজ্ঞানীরা বছরের কয়েক মাস আইসিটিপি-তে এসে বিশ্বের প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেতেন। তারপর নিজের দেশে ফিরে গিয়ে বাকি সময় গবেষণা চালিয়ে যেতেন। অর্থাৎ, সালামের লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞানীদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা নয়, দেশে থেকেই বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ তৈরি করা। ভারতের বহু পদার্থবিজ্ঞানী এর দ্বারা উপকৃত হয়েছেন।
১৯৫৪ সালে সালাম আবার কেমব্রিজে শিক্ষকতায় যোগ দেন। ১৯৫৭ সাল থেকে তিনি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন-এ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। পাশাপাশি ১৯৬৪ সাল থেকে ICTP-র পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাত্ত্বিক কণাপদার্থবিদ্যায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন সালাম। এই সময়ে ক্ষেত্রটির বহু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাঁর গবেষণা শুধু বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেয়নি, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাননীতিতেও তাঁর প্রভাব তৈরি করেছিল। সালাম, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ আর শেলডন গ্ল্যাশো একত্রে ১৯৭৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান ইলেক্ট্রোউইক তত্ত্ব নিয়ে দিক্দর্শী গবেষণার জন্য। নোবেল পুরস্কার ফাউন্ডেশন বিজ্ঞানীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং একটি বিবৃতি জারি করে বলে: “মৌলিক কণাগুলির মধ্যে একীভূত দুর্বল এবং তড়িৎচুম্বকীয় মিথস্ক্রিয়ার তত্ত্বে অবদানের জন্য পুরস্কৃত করা হল, যার মধ্যে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি দুর্বল চার্জ-হীন প্রবাহের ভবিষ্যদ্বাণীও অন্তর্ভুক্ত”। সালাম নোবেল পুরস্কার পদকটি কলকাতার ভবানীপুরে তার মরণাপন্ন প্রাক্তন অধ্যাপক অনিলেন্দ্র গাঙ্গুলীর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পদকটি তাঁর গলায় পরিয়ে দিয়ে বলেন, ” স্যার, এই পদক আপনারই শিক্ষাদান এবং গণিতের প্রতি ভালোবাসার ফল। আপনিই আমার মধ্যে সেই ভালোবাসা সঞ্চারিত করেছিলেন”।
উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে তিনি জাতিসংঘের একাধিক কমিটির সঙ্গেও কাজ করেন। তাঁর ব্যস্ততার মাত্রা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য। ছুটি, পার্টি বা বিনোদনের মতো বিষয়কে তিনি জীবনের প্রায় অপ্রয়োজনীয় অংশ হিসেবেই দেখতেন। আইসিটিপি-র কর্মীদের কাছেও তাঁর কাজের গতি ছিল এক ধরনের উদাহরণ। সালাম যে শুধু গবেষক ছিলেন, তা নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া চাই। ‘অ্যাটমস ফর পিস’ পদক ও পুরস্কার থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে তিনি পাকিস্তানি তরুণ পদার্থবিদদের আইসিটিপি-তে যাওয়ার জন্য একটি তহবিল তৈরি করেন। নোবেল পুরস্কারের অর্থও নিজের জন্য ব্যবহার করেননি, উন্নয়নশীল দেশগুলির পদার্থবিদদের কাজে ব্যয় করেছিলেন।
২১ নভেম্বর ১৯৯৬ ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে তাঁর মৃত্যু হয়।
আবদুস সালাম ছিলেন গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী মুসলিম। তবে ধর্ম তাঁকে সংকীর্ণতার পথে নিয়ে যায়নি, বরং বিশ্বের সব ধর্মের সকল মানুষের স্বার্থে বিজ্ঞানচর্চার দিকে প্রণোদিত করেছিল। আবদুস সালামের জীবন তাই শুধু একজন অসাধারণ প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর সাফল্যের কাহিনী নয়। এ এমন এক বিজ্ঞানীর কাহিনী, যিনি নিজের বৈজ্ঞানিক সাফল্যের পাশাপাশি উন্নয়নশীল বিশ্বের আরও বহু তরুণের জন্য বিজ্ঞানের দরজা খুলে দিতে চেয়েছিলেন। জন্মশতবর্ষে এই মহান বিজ্ঞানী ও মহান মানুষের প্রতি প্রণাম জানাই।
সূত্র: The Nobel Foundation 1979, and September 16, 2026.
