আমাজনের ফুটন্ত নদী 

আমাজনের ফুটন্ত নদী 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১২ জুন, ২০২৬

পেরুর গহীন আমাজন অরণ্যের অন্তঃস্থল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর নদী শানাই-টিমপিশকা, যা “বয়লিং রিভার” বা ফুটন্ত নদী নামেও পরিচিত। এটি পচিটিয়া নদীর একটি উপনদী, যা পরবর্তীতে আমাজন নদীব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রকৃতির এই অসাধারণ সৃষ্টি বিজ্ঞানী, পর্যটক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী সবার কাছেই সমানভাবে বিস্ময়ের বিষয়।

প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর নীচের অংশের প্রায় ৬.৩ কিলোমিটার জুড়ে জলের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি। কিছু কিছু স্থানে উষ্ণ প্রস্রবণের জল ৯৯.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যেটা জলের স্ফুটনাঙ্কের খুব কাছাকাছি। নদীর অনেক অংশে গড় তাপমাত্রা প্রায় ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। এই তাপমাত্রা এতটাই বিপজ্জনক যে মানুষ বা প্রাণী অসাবধানতাবশত জলে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে মারাত্মক দগ্ধ হতে পারে। এমনকি ছোট প্রাণীর জীবন্ত সেদ্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

অথচ নদীর উৎসস্থলে দৃশ্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে জলের তাপমাত্রা প্রায় ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অর্থাৎ একটি সাধারণ জঙ্গলের ঝরনার মতোই শীতল। নদীটি যখন ভূগর্ভস্থ ফল্ট বা ভূতাত্ত্বিক ফাটল অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন পৃথিবীর গভীর থেকে উঠে আসা অতিতপ্ত জল নদীর সঙ্গে মিশে যায়। এর ফলেই জলের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় এবং নদীটি ফুটন্ত অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই নদীর আশেপাশে কোনো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি নেই। নিকটতম আগ্নেয়গিরিটি প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করেন, নদীর তাপের উৎস হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভূ-তাপীয় শক্তিবিস্তার বা জিওথার্মাল গ্রেডিয়েন্ট। ভূগর্ভস্থ জল পৃথিবীর গভীর স্তরে প্রবেশ করে তাপ শোষণ করে এবং পরে ফাটলপথে উপরে উঠে এসে নদীকে উত্তপ্ত করে।

স্থানীয় আশানিঙ্কা জনগোষ্ঠী এই নদীকে শানাই-টিমপিশকা নামে ডাকে, যার অর্থ হল সূর্যের তাপে সেদ্ধ হওয়া। যদিও তাদের লোককাহিনীতে সূর্যের তাপকে এর উৎস হিসেবে ধরা হয়, আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে প্রকৃত কারণ হলো ভূ-তাপীয় শক্তি। সবচেয়ে চমকের বিষয় হল নদীর জল অত্যন্ত গরম হলেও তা তুলনামূলকভাবে বিশুদ্ধ এবং পানযোগ্য।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই নদী নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছেন। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম তাপীয় নদীগুলোর একটি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ করছেন, কীভাবে আশপাশের উদ্ভিদ ও প্রাণীকুল এই চরম উষ্ণ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

শানাই-টিমপিশকা নদীটি প্রকৃতির বুকে লুকিয়ে থাকা শক্তির এক জীবন্ত উদাহরণ। স্থানীয় লোককথা, ভূ-তাত্ত্বিক রহস্য এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের এক অনন্য মিলনস্থল হিসেবে এটি আজও মানবজাতিকে মুগ্ধ করে চলেছে।

 

সূত্র: Science Acumen

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine + 15 =