আধা শতাব্দী পর আবার চাঁদ অভিযানের নতুন অধ্যায় শুরু করেছে নাসার আর্টেমিস কর্মসূচি। আর্টেমিস–২ মিশনের ওরিয়ন মহাকাশযান পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। এর মাধ্যমে এই মিশনের সমাপ্তি হলেও, চাঁদে মানুষের প্রত্যাবর্তনের বড় পরিকল্পনা এখনই শেষ নয়। বরং সামনে রয়েছে আরও বড় ও জটিল কয়েকটি ধাপ।
আর্টেমিস–৩:
আগে ধারণা করা হয়েছিল, ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো–১৭–এর পর আবার আর্টেমিস–৩ মিশনেই মানুষ আবার চাঁদের মাটিতে পা রাখবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আপাতত বদলেছে। এখন নাসা জানিয়েছে, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নির্ধারিত আর্টেমিস–৩ মিশন মূলত প্রযুক্তি পরীক্ষার উপরেই জোর দেবে। এই মিশন অনেকটা ১৯৬৯ সালের অ্যাপোলো–৯–এর মতো হবে। তখন নভোচারীরা কমান্ড মডিউল ও লুনার মডিউলের মধ্যে সংযোগ, বিচ্ছিন্নকরণ এবং ডকিং প্রক্রিয়া পরীক্ষা করেছিলেন। একইভাবে আর্টেমিস–৩–এ নভোচারীরাও পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে গিয়ে একটি বিশেষ অবতরণযানের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার মহড়া দেবেন। এই অবতরণযানকে বলা হচ্ছে হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম ( এইচএলএস)। ভবিষ্যতে এই যানই নভোচারীদের চাঁদের কক্ষপথ থেকে চন্দ্রপৃষ্ঠে নামাবে এবং পরে আবার ওরিয়ন মহাকাশযানে করে ফিরিয়ে আনবে।
তবে এখনও নিশ্চিত নয়, কোন সংস্থা এই অবতরণযান সরবরাহ করবে। প্রতিযোগিতায় রয়েছে ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের স্টারশিপ এইচএলএস এবং জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিনের ব্লু মুন মার্ক–২। নাসা দুটিকেই পরীক্ষার আওতায় আনতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের চাঁদযাত্রায় বেসরকারি মহাকাশ প্রতিযোগিতাও বড় ভূমিকা নিতে চলেছে।
আর্টেমিস–৪:
বর্তমান সূচি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের শুরুতে আর্টেমিস–৪ মিশন হবে মানুষের প্রকৃত চাঁদে প্রত্যাবর্তন। এই অভিযানে আবার মানুষ চাঁদের মাটিতে নামবে। যা ইতিহাস তৈরি করবে। কারণ সেই প্রথম কোনো নারী নভোচারিণী চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটবেন। মিশন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে অবতরণযানকে চাঁদের কক্ষপথে পাঠানো হবে। তারপর চার নভোচারী নিয়ে ওরিয়ন মহাকাশযান সেখানে পৌঁছাবে। দুটি যান সংযুক্ত হওয়ার পর দুই নভোচারী অবতরণযানে উঠে চাঁদের মাটিতে নামবেন। সেখানে তারা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালাবেন এবং নতুন অঞ্চল অনুসন্ধান করবেন।
নাসার প্রধান আগ্রহ এখন চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চল। সেখানে বরফ থাকার প্রমাণ মিলেছে। বরফ মানে জল, আর জল ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি মানব বসতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদের দক্ষিণ মেরু অ্যাপোলো মিশনের অবতরণস্থলগুলোর থেকে একেবারেই আলাদা। সেখানে রয়েছে বহু প্রাচীন ভূখণ্ড, স্থায়ী ছায়াচ্ছন্ন গহ্বর এবং এমন এলাকা যেখানে সূর্যের আলো খুব কম পৌঁছায়। এসব জায়গায় জল, খনিজ বা অন্য উপযোগী উপাদান থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এখনও নির্দিষ্ট অবতরণস্থল ঠিক করা হয়নি। তবে নাসা ইতিমধ্যে নয়টি সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করেছে।
আর্টেমিস–৫:
২০২৮ সালের শেষের দিকে নির্ধারিত আর্টেমিস–৫ মিশনের লক্ষ্য আরও বড়। এই মিশনের মাধ্যমে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হতে পারে। পরিকল্পনায় রয়েছে একটি আধুনিক লুনার টেরেইন ভেহিকল বা নতুন চন্দ্র পৃষ্ঠযান ব্যবহার। এটি অ্যাপোলো যুগের লুনার রোভারের আধুনিক সংস্করণ। এই যান নভোচারীদের দূরবর্তী এলাকায় দ্রুত চলাচল ও গবেষণা করতে সহায়তা করবে। আর্টেমিস–৫–এর পর নাসা ধীরে ধীরে চাঁদে স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তুলতে চায়। প্রথম ধাপে বিচ্ছিন্ন অভিযানের বদলে নিয়মিত ও পরিকল্পিত মিশন চালু করা হবে। লক্ষ্য, প্রতি ছয় মাসে নতুন দল পাঠানো। এরপর ধাপে ধাপে চাঁদে পাঠানো হতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, রোভার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বাসযোগ্য মডিউল। শেষ পর্যায়ে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী স্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন সহজ নয়। এর জন্য লাগবে বিপুল অর্থ, উন্নত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সামান্য বিলম্ব বা বাজেট সংকটও সময়সূচি বদলে দিতে পারে। তবু আর্টেমিস শুধু আরেকটি মহাকাশ অভিযান নয়। এটি মানবজাতির পরবর্তী বড় পদক্ষেপের প্রস্তুতি। চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি হলে ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর পথও সহজ হবে। তবে প্রশ্ন শুধু সেখানে পৌঁছানো নয়, কতদূর এগোনো যায়।
সূত্র: Nautilus, April, 2026
