আলঝেইমার রোগের নতুন ওষুধ?  

আলঝেইমার রোগের নতুন ওষুধ?  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ জুলাই, ২০২৬

লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণায থেকে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার দেখা গেছে। KCL-286 নামের একটি পরীক্ষামূলক ওষুধ মূলত মেরুদণ্ডের রজ্জুর (স্পাইনাল কর্ড) আঘাতের চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেল, সেটি আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে ডিএনএ ক্ষতি মেরামত, প্রদাহ কমানো এবং রোগের সঙ্গে জড়িত একাধিক জৈবিক পরিবর্তন একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওষুধটি ইতিমধ্যে ফেজ-১ মানব নিরাপত্তা ও সহনীয়তার পরীক্ষায় সফল হয়েছে। ফলে এটি আলঝেইমারের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় বেশ দ্রুত অগ্রসর হতে পারে বলে গবেষকদের আশা।

আলঝেইমার রোগ সাধারণত মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড-বিটা (amyloid-beta) ও টাউ (tau) প্রোটিন জমার সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্তমানে অনুমোদিত বেশিরভাগ ওষুধ এই অ্যামাইলয়েড-বিটা কমানোর ওপরই গুরুত্ব দেয়। তবে এসব চিকিৎসা রোগের অগ্রগতি খুব সীমিত মাত্রায় কমাতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এখন রোগের আরও প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলোর দিকে নজর দিচ্ছেন – বিশেষ করে ডিএনএ-র ক্ষতি এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ, যা আলঝেইমারের একেবারে শুরু থেকেই দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, KCL-286 শুধু ডিএনএ মেরামতই করে না, একই সঙ্গে মস্তিষ্কের প্রদাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। এই দ্বিমুখী কার্যকারিতা একে প্রচলিত চিকিৎসার তুলনায় ভিন্ন ও সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। গবেষকদের মতে, এটি কেবল রোগের উপসর্গ কমানোর পরিবর্তে রোগের অগ্রগতিকেই ধীর বা পরিবর্তন করতে সক্ষম হতে পারে।

KCL-286 কাজ করে রেটিনয়িক অ্যাসিড রিসেপ্টর-বিটা (RARβ) নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনকে সক্রিয় করার মাধ্যমে। এই প্রোটিন ভিটামিন-এ বিপাকের সঙ্গে যুক্ত একটি জৈব রাসায়নিক পথ নিয়ন্ত্রণ করে। পূর্ববর্তী গবেষণা থেকে দেখা গেছে, এই পথের ভারসাম্য নষ্ট হলে মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড-বিটা জমা বাড়তে পারে। এছাড়া KCL-286 ভাঙা ডিএনএর দ্বিতন্ত্রের ভাঙন মেরামত করতে সক্ষম। এই ধরনের ক্ষতিকে গবেষকরা তুলনা করেছেন একটি দড়ি মাঝখান থেকে সম্পূর্ণ ছিঁড়ে যাওয়ার সঙ্গে, যা কোষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। ওষুধটি এই ক্ষতি মেরামত করে স্নায়ুকোষকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।

গবেষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, মেরুদণ্ড রজ্জুতে আঘাত এবং আলঝেইমারের মধ্যে কিছু অভিন্ন আণবিক পথ রয়েছে। সেই কারণেই মেরুদণ্ড রজ্জুর চিকিৎসার জন্য তৈরি KCL-286 আলঝেইমারের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি একাধিক কোষীয় সংকেতপথকে একসঙ্গে প্রভাবিত করে, যাদের অনেকগুলোই রোগের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে সক্রিয় হয়।

 

যদিও এই গবেষণার ফলাফল এখন পর্যন্ত ইঁদুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তবুও KCL-286 ইতিমধ্যে মানুষের নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় ভবিষ্যতে আলঝেইমার রোগীদের ওপর এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দ্রুত শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদি মানবদেহেও একই ধরনের ফল পাওয়া যায়, তাহলে KCL-286 আলঝেইমারের চিকিৎসায় এক নতুন প্রজন্মের ওষুধ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি রোগীর জন্য তা নতুন আশার বার্তা বয়ে আনতে পারে।

 

সূত্র:Natasha Hill, Hassan Yousef Othman AlMuallim, Elouisa Maddock, Carl Hobbs, Earl Clarke, Maria B. Goncalves, Jonathan P. T. Corcoran. Treatment with KCL‐286, a first‐in‐class retinoic acid receptor‐β (RARβ) agonist, ameliorates neuronal DNA damage and inflammation in a mouse model of Alzheimer\’s disease. FEBS Open Bio, 2026; DOI: 10.1002/2211-5463.70284

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 5 =