এননাক্কাল চণ্ডী জর্জ সুদর্শন বা ই. সি. জর্জ সুদর্শন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানজগতে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অন্যতম প্রভাবশালী পদার্থবিজ্ঞানী রূপে নন্দিত। তাঁর চিন্তার বিস্তার আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছিল। কণা পদার্থবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম অপটিক্স, কোয়ান্টাম তথ্য, কোয়ান্টাম ফিল্ড তত্ত্ব, গেজ তত্ত্ব, সাবেকি বলবিদ্যা এবং পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক দর্শন সহ পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা আজও বহুল চর্চিত বিষয়।
১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কেরলের কোট্টায়ামের কাছে পাল্লামে তাঁর জন্ম। তাঁর মা আচাম্মা ছিলেন শিক্ষিকা এবং বাবা ই. আই. চণ্ডী রাজস্ব বিভাগের কর্মী। ছোটবেলা থেকে প্রকৃত শিক্ষার পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। কোট্টায়ামের CMS College-এ প্রাথমিক উচ্চশিক্ষার পর তিনি চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ খ্রিস্টান কলেজে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৫১ সালে B.Sc. (Honours) সম্পন্ন করার পর কিছুদিন সেখানেই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে MA ডিগ্রি অর্জন করে তিনি মুম্বইয়ের টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ বা-এ গবেষক ছাত্র হিসেবে যোগ দেন। সেখানেই তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের মোড় ঘুরে যায়। প্রথমদিকে তাঁকে কণা পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষামূলক গবেষণায় কাজ করতে দেওয়া হলেও দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তাঁর প্রকৃত শক্তি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে। তিনি তাত্ত্বিক গবেষণায় চলে আসেন এবং ভারতের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীদের সংস্পর্শে এসে নিজের চিন্তাকে আরও বিস্তৃত করেন। পরবর্তীকালে তাঁর গবেষণা তাঁকে বিশ্বের বহু বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টার, হার্ভার্ড, সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স, বেঙ্গালুরু, ইনস্টিটিউট অব ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেস, চেন্নাই এবং ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে তিনি গবেষণা ও অধ্যাপনা করেন। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দীর্ঘ ৪৭ বছর অধ্যাপনা করেছিলেন।
সুদর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলির একটি ছিল দুর্বল নিউক্লীয় বলের V-A(Vector–Axial Vector) তত্ত্ব। রবার্ট মার্শাকের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি এই তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। পরে এই ধারণাই দুর্বল ও তড়িৎচুম্বকীয় বলের একীভূত তত্ত্ব নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। স্টিভেন ওয়াইনবার্গ, আবদুস সালাম ও শেলডন গ্ল্যাশো সেই বৃহত্তর একীকরণ তত্ত্বের উপর কাজ জন্য ১৯৭৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
তবে শুধু কণা পদার্থবিজ্ঞানেই তাঁর প্রতিভা সীমাবদ্ধ ছিল না। কোয়ান্টাম অপটিক্সে তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়। তিনি আলোর কোয়ান্টাম প্রকৃতি প্রকাশের জন্য একটি গাণিতিক উপস্থাপন পদ্ধতি তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে Sudarshan–Glauber representation নামে পরিচিত হয়। এই কাজ কোয়ান্টাম অপটিক্স-কে একটি স্বতন্ত্র গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হতে সাহায্য করে। তাঁর গবেষণা দেখায়, আলোর কিছু আচরণ সাবেকি তরঙ্গতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলেও কিছু ঘটনা একেবারেই কোয়ান্টাম প্রকৃতির।
সুদর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল dynamical maps-এর আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা। উন্মুক্ত কোয়ান্টাম সিস্টেম অর্থাৎ পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় থাকা কোয়ান্টাম ব্যবস্থার আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে এই কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যনাথ মিশ্রের সঙ্গে তিনি Quantum Zeno Effect-এর ধারণাও সামনে আনেন। কোয়ান্টাম জগতের এই অদ্ভুত প্রভাব অনুযায়ী, একটি কোয়ান্টাম সিস্টেমকে অত্যন্ত ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করলে তার স্বাভাবিক বিবর্তন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তাঁর গবেষণার আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায় হলো ট্যাকিয়ন। ছাত্র ভি. কে. দেশপাণ্ডের সঙ্গে সুদর্শন এমন কণার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করেন, যা আলোর চেয়েও দ্রুত চলতে পারে। এমন কণা সত্যিই থাকলে কার্য-কারণের স্বাভাবিক সম্পর্ক নিয়ে মৌলিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত ট্যাকিয়নের অস্তিত্বের কোনো পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, ধারণাটি বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তনপ্রয়াস হিসেবে রয়ে গেছে।
সুদর্শনের বৈজ্ঞানিক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর শিক্ষকসত্তাও ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি মনে করতেন জ্ঞান কেবল আবিষ্কারের বিষয় নয়, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও একজন সফল বিজ্ঞানীর দায়িত্ব। তিনি ৫০০-র বেশি গবেষণাপত্র এবং প্রায় ১০টি বই রচনা করেন। তাঁর লেখার বিষয় ছিল পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শন ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার নানা দিক।
সুদর্শনের জীবন একজন সফল বিজ্ঞানীর ইতিবৃত্তর পাশাপাশি ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভিত থেকে উঠে এসে বিশ্ববিজ্ঞানের কেন্দ্রে নিজের জায়গা করে নেওয়ার কাহিনী। তাঁর গবেষণা দেখিয়েছে, একজন বিজ্ঞানীর প্রভাব একটি মাত্র শাখায় সীমাবদ্ধ থাকে না। কণা থেকে আলো, কোয়ান্টাম জগত থেকে মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম প্রভৃতি বিজ্ঞানের বহু কঠিন প্রশ্নকে তিনি নতুন দৃষ্টিতে দেখেছেন। সেই কারণেই ই. সি. জর্জ সুদর্শন বিশ্বের আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অসাধারণ ও বহুমাত্রিক মহীরুহ।
সূত্র: “Amazing Physics” https://amazingphysics.in/home/blog/49
