ইলেকট্রনকে দিয়েই কেন্দ্রকের ছবি তোলানো 

ইলেকট্রনকে দিয়েই কেন্দ্রকের ছবি তোলানো 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ জুলাই, ২০২৬

পদার্থবিদরা অল্প কাল আগে প্রথম তেজস্ক্রিয় অণু রেডিয়াম মনোফ্লোরাইড (RaF)-এর নিজস্ব ইলেকট্রন ব্যবহার করেই এর পরমাণু কেন্দ্রকের অভ্যন্তরীণ গঠনের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষণার বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্স পত্রিকাতে। এতে দেখা গেছে, RaF-এর কিছু ইলেকট্রন শুধু নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘোরেই না, একেবারে সরাসরি নিউক্লিয়াসের ভেতরে প্রবেশ করে সেখানকার প্রোটন ও নিউট্রনের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটায়। এই বিরল ঘটনাকে Bohr-Weisskopf প্রভাব বলা হয়। গবেষকদের মতে, কোনো অণুতে এই প্রভাব এই প্রথম প্রত্যক্ষ করা গেল।

গবেষণায় ব্যবহৃত রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয় সমস্থানিক ²²⁵Ra অত্যন্ত বিরল, এটি উৎপাদন করা কঠিন। এটি তৈরি করতে বড় কণা ত্বরণ যন্ত্র প্রয়োজন হয় এবং একবারে এক ন্যানোগ্রামেরও কম পরিমাণে উৎপন্ন হয়। এর অর্ধায়ু মাত্র প্রায় ১৫ দিন, তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সময়ও খুব কম পাওয়া যায়। ফলে অতি অল্প নমুনা নিয়ে অত্যন্ত সংবেদী ও নির্ভুল প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষণা সম্পন্ন করতে হয়েছে।

RaF-কে বেছে নেওয়ার কারণ, তাত্ত্বিকভাবে এটি প্রকৃতির মৌলিক প্রতিসাম্য ভঙ্গের সূক্ষ্ম প্রভাব শনাক্ত করার জন্য অত্যন্ত সংবেদী। এর প্রধান কারণ, রেডিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াস সাধারণ গোলাকার নয়; এটি নাশপাতির মতো বিকৃত আকৃতির। এই অস্বাভাবিক গঠন নিউক্লিয়াসের ভেতরকার পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কে আরও সূক্ষ্ম তথ্য সংগ্রহের সুযোগ দেয়।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা RaF-এর হাইপারফাইন গঠন বিশ্লেষণ করেছেন। এটি ইলেকট্রনের স্পিন ও নিউক্লিয়াসের স্পিনের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট হয়। সাধারণত ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াসের মিথস্ক্রিয়াকে দূরপাল্লার বলে ধরা হয়। কিন্তু RaF-এ ইলেকট্রনগুলো অণুর বিশেষ চরিত্রের কারণে নিউক্লিয়াসের খুব কাছাকাছি চলে আসে, অনেক সময় সরাসরি নিউক্লিয়াসের ভেতর প্রবেশ করে। এর ফলে ইলেকট্রনের শক্তিস্তরে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে, যা অত্যন্ত নির্ভুল স্পেকট্রোস্কোপিক পরিমাপ ও উন্নত তাত্ত্বিক গণনার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। এভাবে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে অত্যন্ত সংবেদী প্রোব বা সন্ধায়ক হিসেবে কাজ করেছে।

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কেবল নিউক্লিয়াসের গঠন বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভবিষ্যতে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরে নতুন পদার্থবিজ্ঞানের সন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান তত্ত্ব অনুযায়ী, বিগ ব্যাংয়ের সময় সম পরিমাণ পদার্থ ও প্রতিপদার্থ (antimatter) সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে মহাবিশ্বে পদার্থেরই আধিক্য দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পদার্থ ও প্রতিপদার্থের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পার্থক্য বা মৌলিক প্রতিসাম্য ভঙ্গ এই রহস্যের ব্যাখ্যা দিতে পারে।

 

গবেষকদের মতে, RaF-এর মতো তেজস্ক্রিয় অণু ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আরও নির্ভুল লেজার স্পেকট্রোস্কোপি পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এ ধরনের গবেষণা নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান, মৌলিক বলের প্রকৃতি, মহাবিশ্বে পদার্থের উৎপত্তি এবং জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

 

সূত্র:Particle and nuclear | Workshop26th Hellenic School and Workshops on Elementary Particle Physics and Gravity19 April — 21 September 2026 .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × four =