উইলিয়াম শক্লি ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর হাতে আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে উঠেছিল, আবার সেই মানুষটিই নিজের চিন্তা ও আচরণের মাধ্যমে প্রায় নিজেকেই ইতিহাস থেকে মুছে ফেলেছিলেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর প্রজ্ঞা এক জিনিস নয়, এবং একবার সঠিক হওয়া মানেই আজীবনের নৈতিক কর্তৃত্ব পাওয়া নয়। শক্লির জীবন এক জ্বলন্ত দ্বন্দ্ব— সৃষ্টি ও ধ্বংস, অগ্রগতি ও অবক্ষয়ের।
সালটা ১৯৪৭। নিউ জার্সির বেল ল্যাবরেটরিতে তখন বিজ্ঞানীরা এক মৌলিক সমস্যার সমাধান খুঁজছেন , কীভাবে ভঙ্গুর, অস্থির ভ্যাকুয়াম টিউবের বদলে এমন এক পোক্ত যন্ত্র তৈরি করা যায়, যা নির্ভরযোগ্যভাবে বৈদ্যুতিক সংকেত বাড়াতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সেই সমস্যার সমাধানেই উইলিয়াম শক্লি, জন বার্ডিন ও ওয়াল্টার ব্রাটেইন তৈরি করেন একটি ক্ষুদ্র অর্ধপরিবাহী যন্ত্র যার নাম ট্রানজিস্টর। এর কাজ হল বিদ্যুৎ প্রবাহকে বাধা দেওয়া বা প্রসারিত করার মাধ্যমে সার্কিটকে কার্যকর রাখা।
এই ছোটো যন্ত্রটিই আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের ভিত্তিপ্রস্তর। এই আবিষ্কারের জন্য শক্লি ১৯৫৬ সালে জন বার্ডিন ও ওয়াল্টার ব্রাটেইনের সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। আজকের সিলিকন ভ্যালি, তথ্যযুগ, ডিজিটাল সভ্যতা—সবকিছুরই বীজ রোপিত হয় সেই মুহূর্তে। এই চরম সাফল্যের পর এখানে থেমে যাওয়াই হয়তো শক্লির জন্য শ্রেয় ছিল। কিন্তু তিনি থামেননি। বেল ল্যাব ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় এসে তিনি শক্লি সেমিকন্ডাক্টর ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল পরবর্তী প্রযুক্তিগত বিপ্লবে নিজ হাতে নেতৃত্ব দেওয়া। কিন্তু যা তিনি গড়ে তুললেন, তা হয়ে উঠল এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। হাতেকলমে প্রমাণিত হল, কীভাবে অহংকার ও কর্তৃত্বর মোহ সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করতে পারে। শক্লি ক্রমশ হয়ে উঠলেন অকারণ সন্দেহপ্রবণ, স্বৈরতান্ত্রিক ও অবিশ্বাসী। তিনি নিজের কর্মীদের উপর মিথ্যা শনাক্তকারী পরীক্ষা চালাতেন, কৃতিত্ব নিজের দখলে কুক্ষিগত রাখতেন। নেতৃত্ব নয়, তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভয় দেখিয়ে শাসন করার পথ। ফলে এক দুর্বিষহ পরিণতি অনিবার্য ছিল।
একদিন তাঁর প্রতিষ্ঠানের আটজন সেরা প্রকৌশলী একসঙ্গে পদত্যাগ করেন। রাগে ও অপমানে শক্লি তাদের নাম দেন ” আট বিশ্বাসঘাতকের দল” । অথচ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, এই আটজনই পরে ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয় ইন্টেল (বিশ্বের বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টার প্রস্তুতিকারক)-সহ পুরো সিলিকন ভ্যালির ইকোসিস্টেম। শক্লি নিজে যে ভবিষ্যৎ তৈরি করেছিলেন, সেটাই তিনি হাতছাড়া করলেন। এই ব্যর্থতা তাঁকে আরও কঠোর করে তোলে।
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে শক্লি তাঁর বুদ্ধিমত্তাকে এক ভিন্ন ও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক পথে প্রবাহিত করেন। তিনি প্রকাশ্যে সুপ্রজনন-এর পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন। দাবি করেন—বুদ্ধিমত্তা জাতিগতভাবে নির্ধারিত, এবং সমাজের উচিত অযোগ্য ও নিম্নমানের মানুষদের প্রজননে নিরুৎসাহিত করা। তিনি এই ধারণাগুলো প্রচার করেন বক্তৃতা দিয়ে, প্রবন্ধ লিখে, বিতর্ক উসকে দিয়ে, সেই একই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে, যেটা একসময় তাঁকে পদার্থবিজ্ঞানের সীমা ভাঙতে সাহায্য করেছিল।
এক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিক্রিয়া হল আরও নির্মম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাঁর থেকে দূরে সরে গেল। সহকর্মীরা প্রকাশ্যে তাঁর মতাদর্শ প্রত্যাখ্যান করলেন। বৈজ্ঞানিক সমাজ তাঁর দাবিগুলোকে অ-বৈজ্ঞানিক, ক্ষতিকর ও নৈতিকভাবে বিপজ্জনক বলে বাতিল করে দিল। যে মানুষটি আজকের ডিজিটাল যুগের পথ প্রশস্ত করেছিলেন, তিনিই হয়ে ওঠেন এক নৈতিক বিপদের সতর্কবার্তা । ক্ষমতা যখন বিনয় ও নৈতিকতা ছাড়া ব্যবহৃত হয়, তখন তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে শকলির জীবন তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
তবুও শক্লি কখনোই নিজের মতাদর্শ থেকে সরে আসেননি। ১৯৮৯ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি দাবি করে গেছেন, তিনি নাকি অপ্রিয় সত্য বলার জন্য নিপীড়িত। ইতিহাস অবশ্য ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁর প্রযুক্তিগত অবদান অমর হয়েছে, যা আজও মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। কিন্তু তাঁর সামাজিক তত্ত্বগুলো যুক্তি, মানবিকতা ও নৈতিকতার দৃষ্টিভঙ্গিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
উইলিয়াম শক্লির জীবন এক গভীর বৈপরীত্যের সাক্ষ্য। তিনি মানবজাতিকে এমন হাতিয়ার দিয়েছেন, যা জ্ঞান, যোগাযোগ ও সম্ভাবনার পরিসর বাড়িয়েছে। আবার সেই একই মানুষ তাঁর অবস্থান ব্যবহার করেছেন এমন ধারণা ছড়াতে, যা মানবিক মর্যাদাকে সংকুচিত করেছে ও অন্যকে অমানবিক হিসেবে তুলে ধরেছে। যে আত্মবিশ্বাস তাঁকে প্রকৃতির নিয়ম চ্যালেঞ্জ করতে সাহায্য করেছিল, সেই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে মানুষ সম্পর্কে ভুল বিশ্বাসে অন্ধ করেছে।
তিনি কোনো সরল নায়ক নন, আবার একমাত্রিক খলনায়কও নন। তিনি আপামর জনসাধারণের জন্য এক জীবন্ত শিক্ষা। একবার সঠিক হওয়া মানেই আজীবনের নৈতিক কর্তৃত্ব পাওয়া নয়। সংযমহীন বুদ্ধিমত্তা যেমন একদিকে ভবিষ্যৎ গড়তে পারে, আবার একই সঙ্গে তাকে ধ্বংস করতেও পারে।
সূত্রঃ: True Stories, facebook.
