উষ্ণ ইউরোপ  

উষ্ণ ইউরোপ  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ মার্চ, ২০২৬

সম্প্রতি অস্ট্রিয়ার গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষক গটফ্রিড কির্শেনগাস্ট এবং তাঁর দল একটি “অভূতপূর্ব” গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন। এই মডেল ইউরোপে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব আরও নির্ভুলভাবে পরিমাপ করতে সক্ষম। এই নতুন পদ্ধতি চরম আবহাওয়া কত ঘনঘন ঘটছে, কতদিন স্থায়ী হচ্ছে, কতটা তীব্র হচ্ছে এবং কত বড় ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছে, তা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারে।যেমন, তাপপ্রবাহ, বন্যা ও খরা। ফলে জলবায়ু ক্ষতির জন্য নির্গমন কারী রাষ্ট্র বা কোম্পানিগুলোর দায় কতখানি, তা আরও স্পষ্টভাবে বছরভিত্তিক ও দশকভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ওয়েদার অ্যান্ড ক্লাইমেট এক্সট্রিমস পত্রিকায়। এতে ১৯৬১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের দৈনিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। চরম তাপমাত্রার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয় ১৯৬১-১৯৯০ সময়কালের তুলনায় সর্বোচ্চ ১ শতাংশ বেশি তাপমাত্রাকে ভিত্তি করে। এই হিসাবে অস্ট্রিয়ায় চরম তাপমাত্রার সীমা ধরা হয়েছে ৩০°সেলসিয়াস, দক্ষিণ স্পেনে ৩৫°সেলসিয়াসের বেশি এবং ফিনল্যান্ডে প্রায় ২৫°সেলসিয়াস।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০-২০২৪ সালের মধ্যে অস্ট্রিয়া এবং মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলে তাপপ্রবাহের সামগ্রিক তীব্রতা ১৯৬১-১৯৯০ সময়কালের তুলনায় প্রায় দশগুণ বেড়েছে। কির্শেনগাস্ট বলেন, এই বৃদ্ধি প্রাকৃতিক পরিমাপে ওঠানামার গণ্ডি অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, এটি আর কেবল আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা নয়, স্পষ্টভাবেই মনুষ্যসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফল।

এই চরম তাপের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য ভয়াবহ। গত গ্রীষ্মে ইউরোপের বহু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে, যার ফলে খরা ও প্রবল দাবদাহে একাধিক দেশের হাজারো মানুষের প্রাণ গেছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষণায় ৮৫৪টি ইউরোপীয় শহর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আনুমানিক ২৪,৪০০ তাপজনিত মৃত্যুর মধ্যে ৬৮ শতাংশের জন্য দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন, যা সর্বোচ্চ ৩.৬°সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল ।

২০২৫ সালের গ্রীষ্মে চরম আবহাওয়ার কারণে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে কমপক্ষে ৪৩ বিলিয়ন ইউরো , যা ২০২৯ সালের মধ্যে ১২৬ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা। মানহেইম বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সেহরিশ উসমানের নেতৃত্বে এবং ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক-চতুর্থাংশ অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার প্রভাব পড়েছিল। সরাসরি ক্ষতি ইইউ’র ২০২৪ সালের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের ০.২৬ শতাংশের সমান হলেও, একাধিক দুর্যোগ একসঙ্গে ঘটার যৌথ প্রভাব এতে ধরা হয়নি। সেক্ষেত্রে বাস্তব ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

এই নতুন মডেল শুধু বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নয়, এ এক সতর্কবার্তা। ইউরোপের উত্তপ্ত ভবিষ্যৎ আর সম্ভাবনা নয়, ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

 

সূত্র: ‘Groundbreaking’ model can calculate true impact of climate change and it’s bad news for Europe, Euro news By Liam Gilliver , Published in Weather and Climate Extremes, 24/02/2026 – 7:00 GMT+1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + 17 =