এইচআইভি ভাইরাসের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এ আর টি ) আজ এতটাই কার্যকর যে ভাইরাসকে প্রায় অদৃশ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। একসময়ের মৃত্যুদণ্ডস্বরূপ রোগ এখন দীর্ঘমেয়াদি, নিয়ন্ত্রণযোগ্য অবস্থায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ আর টি গ্রহণের ফলে শরীর নীরব ক্ষতের শিকার হয়, যেমন দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, লিভার ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি, স্নায়বিক সমস্যা ইত্যাদি। ভাইরাস হার মানলেও শরীর যে পুরোপুরি জয়ী হয়, তা কিন্তু নয়। এই বাস্তবতার ভেতরেই এক অপ্রত্যাশিত সম্ভাবনার কথা বলছে টেক্সাস বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণা। গবেষণাটি বলছে— নেশাজনক প্রভাব সৃষ্টি না করেও খুব সামান্য পরিমাণ টি এইচ সি দীর্ঘমেয়াদে এইচআইভি ও এ আর টি –সম্পর্কিত ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে পারে। টি এইচ সি হল টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল। মানুষের মন ও চেতনাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে এই রাসায়নিক উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে, টি এইচ সি শরীরকে উজ্জীবিত করে, অথচ মনকে আচ্ছন্ন করে না।
এই গবেষণাটি সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই গবেষণায় ব্যবহৃত প্রাণী মডেলগুলো এইচআইভি আক্রান্ত ও এ আর টি গ্রহণকারী মানুষের জৈবিক অবস্থার সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ।
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো টি এইচ সি গ্রহণকারীদের দলে প্রদাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, অন্ত্রের ভেতরে বেড়েছে উপকারী জীবাণুর সংখ্যা, আর শরীরের ভেতরের রাসায়নিক ভাষা সেরোটোনিন পেয়েছে নতুন গতি। সেরোটোনিন শুধু মেজাজ বা ঘুমের সঙ্গে যুক্ত হরমোন নয়; এটি অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার একটি মূল রাসায়নিক বার্তাবাহক। অন্ত্র থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত বিস্তৃত সেই সূক্ষ্ম যোগাযোগপথে, যাকে বলা হয় অন্ত্র-মস্তিষ্ক অক্ষ, টি এইচ সি যেন নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। টি এইচ সি এই সেরোটোনিন হরমোনকে সক্রিয় করে তুলে বিষণ্নতা, কুয়াশাচ্ছন্ন মস্তিষ্ক ও মানসিক ক্লান্তি প্রভৃতি সমস্যার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ঢাল গড়ে তুলেছে।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, টি এইচ সি গ্রহণকারী প্রাণীদের রক্তে এ আর টি ওষুধের পরিমাণ কমে গেলেও ভাইরাস দমন সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণে ছিল। অর্থাৎ, কম ওষুধ—কম বিষক্রিয়া, অথচ সমান সুরক্ষা। যেহেতু অনেক এ আর টি যুক্ত ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহারে লিভারের ওপর চাপ ফেলে, তাই এই ফলাফল লিভার সুরক্ষার দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এখানেই শেষ নয় । টি এইচ সি অন্ত্রের জীবাণুগোষ্ঠীকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে, যে তা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ও বিষাক্ত সেকেন্ডারি বাইল অ্যাসিড কমিয়ে হৃদ্যন্ত্র ও লিভারকে দিয়েছে স্বস্তি। ধমনি আটকে দেওয়া চর্বির পরিমাণ কমেছে, বিপাকের ছন্দ ফিরেছে স্বাভাবিক পথে। ফলে হৃদ্রোগ, লিভারের প্রদাহ ও সিরোসিসের ঝুঁকিও হ্রাস পেয়েছে। তিন বছরের গভীর বিশ্লেষণেও গবেষকেরা এর কোনো উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব খুঁজে পাননি। ফলে এই আবিষ্কার আরও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে।
যদিও এই গবেষণা এখনও মানবদেহে সরাসরি প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবু এটা স্পষ্ট করে যে অণুমাত্রিক টি এইচ সি ভবিষ্যতে এইচআইভি চিকিৎসার সহায়ক থেরাপি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন—বাজারি পণ্য ক্যানাবিনয়েড নয়, নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত মাত্রাই এখানে মূল চাবিকাঠি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়। এই গবেষণা শুধু এইচআইভি নয়, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও অন্ত্র–মস্তিষ্ক সংশ্লিষ্ট নানা রোগের চিকিৎসাতেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
সূত্র: Tiny doses of THC show big benefits for HIV treatment, Materials provided by Texas Biomedical Research Institute, published in Science Advances, 2025; 11 (36) DOI: 10.1126/sciadv.adw4021
