এক চুলের ২৫ গুণ পাতলা তুষারমানব

এক চুলের ২৫ গুণ পাতলা তুষারমানব

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ মার্চ, ২০২৬

পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট তুষারমানব। উচ্চতা মাত্র ২.৭ মাইক্রন। তুলনা করতে গেলে বলতে হয়, মানুষের একটি চুলের গড় পুরুত্ব প্রায় ৭৫ মাইক্রন। অর্থাৎ এই তুষারমানবটি এক গাছা চুলের তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ পাতলা। খালি চোখে তো দূরের কথা, শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপ ছাড়া এটিকে স্পষ্টভাবে দেখাও সম্ভব নয়। সুতরাং কল্পনাতীত ক্ষুদ্র এই সৃষ্টি ! এটি এক মাইক্রোস্কোপিক শিল্পকর্ম যা ধুলো কণার থেকেও ছোট। তিনটি খাড়া গোলকের স্তূপ, এক মিনি স্নোম্যান। গবেষকেরা এই ক্ষুদ্র ভাস্কর্যটি বানিয়েছেন সিলিকার তিনটি অতি ক্ষুদ্র গোলক ব্যবহার করে। ঠিক যেমন বরফের গোলা দিয়ে আমরা বড় বড় তুষারমানব বানাই। এই গোলকগুলোকেও একটির ওপর আরেকটি বসিয়ে বানানো হয়েছে শরীরের তিনটি অংশ- নীচের বড় গোলক, মাঝের গোলক আর মাথা। তবে এখানেই শেষ নয়। স্নোম্যানকে জীবন্ত করে তুলতে বিজ্ঞানীরা এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন ছোট্ট ছোট্ট হাত আর একখানা নাক, যেগুলো তৈরি হয়েছে প্ল্যাটিনাম দিয়ে। এমনকি চোখ আর মুখের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রেখাগুলিও কেবল আঁকা নয়, অবিশ্বাস্য সূক্ষ্মতায় খোদাই করা। সূক্ষ্ম কাজটি করা হয়েছে এক বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে, যার নাম ‘ফোকাসড আয়ন বিম’। এ যন্ত্রটি চার্জযুক্ত ক্ষুদ্র কণার স্রোত ছুড়ে দিয়ে কোনো বস্তুর পৃষ্ঠকে কাটতে বা গড়ে তুলতে পারে। একে অনেকটা অণু-স্তরের ছুরি বা খোদাইয়ের সরঞ্জাম বলা যায়। ‘ফোকাসড আয়ন বিম’ কাজ করে এক ধরনের অদৃশ্য কণাস্রোতের মাধ্যমে। সেই কণাগুলো লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত করে ধীরে ধীরে উপাদান সরিয়ে দেয় বা নতুন আকার তৈরি করে। ফলে বিজ্ঞানীরা অবিশ্বাস্য নির্ভুলতায় আণুবীক্ষণিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেন।

সাধারণত প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত হয় ন্যানোপ্রযুক্তি এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক্স গবেষণায়। ক্ষুদ্র চিপের ভেতরের গঠন পরীক্ষা করা, নতুন ধরনের সেন্সর তৈরি করা বা সূক্ষ্ম উপাদান বিশ্লেষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে এটি অপরিহার্য। এক্ষেত্রে অবশ্য এটি ব্যবহার করা হয়েছে একটু ভিন্ন উদ্দেশ্যে। খেলাচ্ছলে ক্ষুদ্র তুষারমানব বানাতেই। কিন্তু এর পেছনের বিজ্ঞানটি মোটেও হালকা নয়। বরং এই কাজ দেখিয়ে দেয় আধুনিক প্রযুক্তি কতটা নিখুঁতভাবে ক্ষুদ্র জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আণুবীক্ষণিক স্তরে কাজ করার দক্ষতা ভবিষ্যতের বহু প্রযুক্তির ভিত্তি। উন্নত সেন্সর, দ্রুততর ইলেকট্রনিক্স, এমনকি সূক্ষ্ম চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির ক্ষেত্রেও এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ক্ষুদ্র কাঠামোর নকশা যত নিখুঁত হবে, প্রযুক্তিও তত উন্নত হবে। তাছাড়া বিজ্ঞান তো সবসময় কঠোর সমীকরণ আর জটিল যন্ত্রপাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কখনও কখনও বিজ্ঞানীরা কেবল দেখাতে চান, প্রযুক্তি দিয়ে কী কী সম্ভব! আর সেই দেখার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কৌতূহল, সৃজনশীলতা এবং মানবিক আনন্দ।

 

সূত্র: Trendora

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − 13 =