এডিসনের বৈদ্যুতিক বাতি ও গ্রাফিন 

এডিসনের বৈদ্যুতিক বাতি ও গ্রাফিন 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু আবিষ্কার আছে, যেগুলো কেবল প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, মানুষের জীবনযাত্রার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। ১৮৭৯ সালে টমাস আলভা এডিসনের তৈরি ব্যবহারযোগ্য বৈদ্যুতিক ভাস্বর বাতি ঠিক তেমনই এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন। কিন্তু এডিসনের হাতে জন্ম নেওয়া এই আবিষ্কার শুধু অন্ধকার ঘরই আলোকিত করেনি, সম্ভবত অনিচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করেছিল ভবিষ্যতের এক বৈপ্লবিক উপাদানের বীজ, যার নাম গ্রাফিন। এই গ্রাফিন হলো কার্বনের একটি অতি পাতলা, দ্বিমাত্রিক আণবিক স্তর, যা মাত্র এক পরমাণু পুরু এবং মৌচাকের মতো ষড়ভুজাকারে বিন্যস্ত। এটি বিশ্বের সবচেয়ে পাতলা, শক্তিশালী এবং বিদ্যুৎ/তাপের সুপরিবাহী উপাদান।

এডিসনের লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত বাস্তব ও তৎকালীন সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। তাঁর ইচ্ছা ছিল একটি এমন ফিলামেন্ট/সরু তার বানানো, যা বিদ্যুৎ প্রবাহে উত্তপ্ত হয়ে দীর্ঘ সময় আলো দিতে পারবে। আজ আমরা জানি, টাংস্টেন এই কাজে আদর্শ; কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগে টাংস্টেন ফিলামেন্ট তৈরি করা প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব ছিল। ফলে এডিসন আশ্রয় নিয়েছিলেন কার্বন ঘটিত উদ্ভিদ উপাদানের। বাতাসের অনুপস্থিতিতে উত্তপ্ত করে তৈরি এই উপকরণে কার্বনের ঘনত্ব ছিল বিপুল। তিনি বিশ্বজুড়ে খুঁজে বেড়ান উপযুক্ত উদ্ভিদ—পামেটো থেকে শণ। পরীক্ষা করেন প্রায় ছয় হাজার প্রজাতি। শেষ পর্যন্ত তিনি জাপানি বাঁশকে সবচেয়ে কার্যকর বলে নির্বাচন করেন। এই বাঁশের ফিলামেন্ট টানা ১,২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় আলো দিতে সক্ষম হয়, যা তৎকালীন যুগে অভাবনীয়।

আজকের বিজ্ঞানীরা জানেন, এডিসনের বাতিতে ব্যবহৃত তাপমাত্রা প্রায় ৩,৬০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, গ্রাফিন তৈরির জন্য একেবারে আদর্শ। গ্রাফিন হলো এক পরমাণু পুরু কার্বনের স্তর, যা ইস্পাতের চেয়েও শক্তিশালী, আবার অবিশ্বাস্যভাবে নমনীয়। কিন্তু এডিসন নিজে কখনও এই পদার্থের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতেন না। কারণ গ্রাফিনের তাত্ত্বিক ধারণা আসে ১৯৪৭ সালে, আর বাস্তবে একে আলাদা করে পাওয়া যায় ২০০৪ সালে। আজ গ্রাফিন আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম ভিত্তি। সেমিকন্ডাক্টর/অর্ধপরিবাহী থেকে শুরু করে কম্পিউটার চিপ, এমআরআই মেশিন, দ্রুত চার্জ হওয়া ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এমনকি শরীরের ভেতরে নিশানা ভিত্তিক ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তিতেও এর সম্ভাবনা বিপুল। অথচ, গ্রাফিন উৎপাদন আজও ব্যয়বহুল ও জটিল।

এই ঐতিহাসিক সংযোগ থেকেই অনুপ্রাণিত হন রাইস ইউনিভার্সিটির ন্যানোম্যাটেরিয়াল গবেষক লুকাস এডি। তিনি লক্ষ্য করেন, স্বল্প সময়ে অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় তাপ প্রয়োগ করলে কার্বনজাত বস্তু থেকে গ্রাফিন তৈরি করা সম্ভব। এই পদ্ধতির নাম “ফ্ল্যাশ জুল হিটিং”। ফলে এরপর তাঁর মনে প্রশ্ন আসে, এডিসনের বাতিতেও কি তার মানে গ্রাফিন তৈরি হয়েছিল? সেই কৌতূহল থেকেই তিনি খুঁজে বের করেন কার্বন ফিলামেন্টযুক্ত পুরোনো ধাঁচের বাতি। অবশেষে নিউইয়র্কের একটি ছোট শিল্প সামগ্রীর দোকানে তিনি পান জাপানি বাঁশের ফিলামেন্টযুক্ত সঠিক বাতি। এডিসনের মতোই ১১০ ভোল্ট সরাসরি বিদ্যুৎ প্রয়োগ করে মাত্র ২০ সেকেন্ড উত্তপ্ত করার পর, লেজার বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায়—সেখানে সত্যিই গ্রাফিন তৈরি হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয় এসিএস ন্যানো সাময়িকীতে।

বিজ্ঞানের ইতিহাস কেবল অতীতের গল্প নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভাণ্ডার। যেমনটি বলেছেন গবেষক জেমস টুর, “যদি আমরা আমাদের বৈজ্ঞানিক পূর্বসূরিদের কাজ আধুনিক জ্ঞানের আলোয় নতুন করে দেখি, তবে হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর সূত্র সেখানেই লুকিয়ে আছে।”

 

সূত্র: Nautilus Magazine, https://www.facebook.com/share/1Dptuxdt11/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + 2 =