‘এল নিনো’ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। সাধারণ সময়ে শক্তিশালী বাতাস গরম জলকে পশ্চিম প্রশান্তে ঠেলে রাখে। কিন্তু যখন সেই বাতাস দুর্বল হয়ে যায়, গরম জল পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখনই তৈরি হয় ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি। এর প্রভাব শুধু সমুদ্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। দক্ষিণ আমেরিকায় বন্যা, অস্ট্রেলিয়ায় খরা, আফ্রিকায় খাদ্যসংকট, এমনকি ভারতের বর্ষাতেও এর প্রভাব পড়ে। জানা যাচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগরের জলে লবণ-মাত্রার সামান্য রদবদলের প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব জুড়ে। নতুন এক গবেষণা বলছে, সমুদ্রের লবণমাত্রার পরিবর্তন ভবিষ্যতে চরম ‘এল নিনো’-র ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, এতদিন যে ঘটনাকে মূলত তাপমাত্রা বদলের দৃষ্টি দিয়ে দেখা হয়েছে, সেখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক, যোগ করতে হবে। সেটি হল লবণের মাত্রা। এতদিন বিজ্ঞানীরা মূলত সমুদ্র-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করেই ‘এল নিনো’-র পূর্বাভাস দিতেন। কিন্তু নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পশ্চিম ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে বসন্তকালে লবণ-মাত্রার একটি নির্দিষ্ট ছাঁদ তৈরি হয়। মধ্য অংশে তুলনামূলক কম লবণযুক্ত জল, তার উত্তরে-দক্ষিণে বেশি লবণযুক্ত জল জমা হয়। এই পার্থক্য জলের ঘনত্ব বদলে দেয়। কম লবণযুক্ত জল হালকা, বেশি লবণযুক্ত জল ভারী। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠে অদৃশ্য এক ঢাল তৈরি হয়, যা গরম জলকে পূর্ব দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করে। এভাবেই ‘এল নিনো’-র সূচনা ত্বরান্বিত হয়। দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্র-পর্যবেক্ষণ ও জলবায়ু মডেল বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, বসন্তকালের এই লবণ প্যাটার্ন থাকলে ‘এল নিনো’ দ্রুত ও শক্তিশালী হয়। কম্পিউটার মডেলে এই লবণ বিন্যাস যুক্ত করলে দেখা যায়, ‘এল নিনো’ প্রায় ২০ শতাংশ বেশি শক্তিশালী ওঠে। চরম ‘এল নিনো’ ঘটার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। আর চরম ‘এল নিনো’ মানে শুধু উষ্ণ সমুদ্র নয়, এক ভয়াবহ আবহাওয়া। অতিবৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, কৃষিক্ষতি, খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা। তাছাড়া এটি বিশ্বব্যাপী বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলে দেয়। যদি চরম ‘এল নিনো’-র ঝুঁকি সত্যিই বাড়ে, তবে কৃষি ও জল ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। সমুদ্রের তাপমাত্রা মাপা অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু লবণ-মাত্রা পরিমাপ করা কঠিন ও ব্যয়বহুল। সাম্প্রতিক উপগ্রহ প্রযুক্তি এখন সমুদ্রের পৃষ্ঠের লবণ-মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে পারছে। ফলে বিজ্ঞানীরা এই প্রথম এত স্পষ্টভাবে এই সম্পর্ক বুঝতে পারছেন। তবে সমস্যা হল, বহু জলবায়ু মডেলে এখনও লবণকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে পূর্বাভাসে এই প্রভাব পুরোপুরি ধরা পড়ে না। গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে লবণ-মাত্রাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখলে ‘এল নিনো’-র আগাম সতর্কতা আরও নির্ভুল হতে পারে। তাই তাপমাত্রার পাশাপাশি লবণকেও এখন থেকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সূত্র : Geophysical Research Letters; Earth .com Feb, 2026
