কম্পিউটারের হাতে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত ? 

কম্পিউটারের হাতে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত ? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. হেলোইজ স্টেভান্স একজন কম্পিউটেশনাল জ্যোতিঃ পদার্থ বিজ্ঞানী। তাঁর কাজ আকাশ সমীক্ষার জন্য বুদ্ধিমান অনুমোদন সিস্টেম তৈরি করা। অর্থাৎ, টেলিস্কোপে ধরা পড়া বিপুল তথ্য থেকে কোন সংকেতটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা মেশিনকে দিয়ে চিনিয়ে নেওয়া। কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতির মাঝেই তিনি তুলছেন এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। আমরা কি বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার অন্ধভাবে কম্পিউটারের হাতে তুলে দিচ্ছি? সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘নিউরাল ইনফরমেশন প্রসেসিং সিস্টেমস সম্মেলন’-এ ধরা পড়েছে, তাদের গৃহীত একাধিক গবেষণাপত্রে ভুয়ো বা “অলীক” রেফারেন্স। একটি-দুটি নয়, শতাধিক। বোর্ডের প্রতিক্রিয়া ছিল সময়েরই প্রতিচ্ছবি। “যদি ১.১% পেপারে LLM ব্যবহারের কারণে ভুল রেফারেন্স থাকে, তাতে মূল গবেষণা অবৈধ হয়ে যায় না। অর্থাৎ এতে কী-ই বা যায় আসে !” এরপরই আসে বৈপরীত্যে ভরা আশ্বাস, তারা নাকি “বৈজ্ঞানিক কঠোরতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” এই শিথিল নৈতিকতা যদি গবেষণার নির্মাণ নকশা হয়ে দাঁড়ায়, তবে বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ কোথায়? প্রশ্নটা এ আই বনাম নীতির লড়াই নয়; প্রশ্নটা আসলে আমরা কোথায়, কীভাবে এবং কতটা বিচক্ষণভাবে এ আই ব্যবহার করছি সেটাকে ঘিরে। বৈজ্ঞানিক কাজে কম্পিউটারকে দায়িত্ব দেওয়া নতুন কিছু নয়। স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ মারফত তা বহু আবিষ্কারকে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু প্রতিটি ‘দায়িত্ব অর্পণে’রই একটি মূল্য আছে। সুবিধা যত বড়, ঝুঁকিও তত গভীর। আজ যে সিদ্ধান্ত আমরা নিচ্ছি, তা আগামী প্রজন্মের তথ্য ভাণ্ডার গড়ে দেবে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ-এর প্রতি বিজ্ঞানীদের একটা দায় আছে। স্টেভান্সের গবেষণার ক্ষেত্র সুদূর নক্ষত্র-বিস্ফোরণ। সেগুলো নতুন মৌল তৈরি করে, সেখান থেকেই জন্ম নেয় গ্রহ, মানুষ, এমনকি স্মার্টফোনের উপাদানও। এই বিস্ফোরণ কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহের বেশি দৃশ্যমান থাকে না। ওই সময়ের মধ্যে ধরতে না পারলে তথ্য হারিয়ে যায় চিরতরে। তাই অ্যাটলাস-এর মতো মহাকাশ সমীক্ষা প্রোগ্রাম রাতের পর রাত আকাশ স্ক্যান করে চলেছে। এক বিশাল ‘স্পট দ্য ডিফারেন্স’ খেলা, যেখানে গতকালের আকাশের সঙ্গে আজকের আকাশের তুলনা করা হয়।

কিন্তু মহাকাশ যে বিশাল। খালি চোখে মাত্র কয়েক হাজার তারা দেখা যায়। আর অ্যাটলাস দেখে এক বিলিয়ন আলোকস্রোত। অ্যাটলাসের তোলা এক রাতের ছবি চোখে দেখে তুলনা করতে গেলে বিজ্ঞানীর এক বছর সময় লেগে যাবে। কিন্তু এখানে সমস্যা দুটি : তথ্যের বিস্ফোরণ, আর সময়ের অভাব। বিজ্ঞানী মানেই ডেডলাইন, গ্র্যান্ট আবেদন, সম্মেলন প্রস্তুতি- চাপ সর্বত্র। তাই বিজ্ঞানীরা মেশিনের কাছে কাজ সঁপে দিচ্ছেন। এখানেই প্রশ্ন হওয়া উচিত, “ গবেষণার স্থায়িত্ব ও উত্তরাধিকারে এই সিদ্ধান্ত কী প্রভাব ফেলবে ?”

স্টেভান্স তিনটি নীতি মেনে চলেন। প্রথমত, ‘ওপেন-ওয়াশিং’ থেকে সাবধান থাকা। “ওপেন” শব্দটি একসময় বোঝাত, যার সোর্স কোড উন্মুক্ত, পুনরুৎপাদনযোগ্য, তথ্য শেয়ার করার জন্য মুক্ত। এখন অনেক মডেল নিজেদের “ওপেন” বলে। কিন্তু তাদের প্রশিক্ষণ- উপাত্ত ও অ্যালগরিদম অদৃশ্য। সুতরাং ফলাফলের পুনরুৎপাদনই যথেষ্ট নয়, মডেলের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়াও বোঝা ও পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। নইলে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতা ভেঙে পড়বে।

দ্বিতীয়ত, জটিল সমস্যায় সরল সমাধান দিয়ে শুরু করতে হবে। “সর্বাধুনিক” মডেলটি ব্যবহার করলেই গবেষণা আধুনিক হয় না। সহজ মডেল দিয়ে কাজ করলেই শুধু চলবে না, সেই সঙ্গে ব্যর্থতারও বিশ্লেষণ করতে হবে। জটিল পদ্ধতি তৈরি করলে সহকর্মীদের উপর পড়ে “বুদ্ধিবৃত্তিক ঋণ”, যা পুনরুৎপাদনযোগ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রযুক্তিগত ঋণের মতোই, এটি জ্ঞানের পক্ষে ক্ষতিকারক।

তৃতীয়ত, সার্বভৌমত্ব রক্ষা। যদি তৃতীয় পক্ষের এ আই এজেন্টকে গবেষণা-সহকারী বানানো হয়, আর হঠাৎ চাঁদার অঙ্ক বেড়ে যায়? কিংবা মডেলের সংস্করণ বদলের দরুন ফলাফল পাল্টে যায়? কিংবা কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়? তাহলে বছরের পর বছর পাবলিক-তহবিলের সাহায্যে গবেষণা মুহূর্তে বিপন্ন হতে পারে। বড় ভাষা মডেল যেমন চ্যাট জি পি টি বা ক্লাউড অ-বিশেষজ্ঞদের জন্য জটিল অ্যালগরিদম প্রয়োগ সহজ করে দিয়েছে। এতে বড় প্রলোভন রয়েছে চটজলদি সমাধান বানিয়ে নেওয়ার। কিন্তু বিজ্ঞানে নিশ্চিতকরণ তো পক্ষপাতের খেলা নয়। কোনো কাজ করলেই প্রশ্ন করতে হবে, “কেন করছি?” তারপর চেষ্টা করতে হবে সেটাকে ভাঙার, কোথায় তার ব্যর্থ হচ্ছে তা দেখার। সাফল্যের সঙ্গে ব্যর্থতাও প্রকাশ করতে হবে। স্টেভান্স স্বীকার করেন, পিছিয়ে পড়ার ভয় তাঁরও আছে। যদি অন্যরা এ আই দিয়ে দ্রুত পেপার লিখে ফেলে? যদি তিনি নৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময় দিতে গিয়ে সুযোগ হারান? তবু শেষ কথা একটাই : বিজ্ঞানী হওয়ার লক্ষ্য প্রকৃতিকে বোঝা। পেপার বা গ্র্যান্ট সেই বোঝার ‘উপায়’ হতে পারে, ‘লক্ষ্য’ নয়। এ আই সাহায্য করতে পারে, কিন্তু কারুর হয়ে বিজ্ঞানকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না। আর কাজের ফলাফল ব্যাখ্যা না দিতে পারলে , এক্ষেত্রে তিনি বিজ্ঞানী থাকছেন না, হয়ে পড়ছেন এক জ্যোতিষী মাত্র।

 

সূত্র: University of Oxford; Jan, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 4 =