কুকুরের মগজ সংকোচন 

কুকুরের মগজ সংকোচন 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ মে, ২০২৬

মানুষের সঙ্গে কুকুরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হাজার হাজার বছরের পুরোনো। সাম্প্রতিক এক চমকপ্রদ গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, মানুষের সঙ্গ পাওয়ার পর কুকুর শুধু আচরণেই বদলায়নি, তাদের মস্তিষ্কও ক্রমে ছোট হয়ে গিয়েছিল। এই পরিবর্তনের কারণ আজও বিজ্ঞানীদের কাছে অমীমাংসিত এক রহস্যের মতোই।

এই নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫,০০০ বছর আগে কৃষিভিত্তিক মানবসমাজ গড়ে ওঠার সময় কুকুরের মস্তিষ্ক দ্রুত ছোট হতে শুরু করে। অর্থাৎ, মানুষের সঙ্গে প্রথম সম্পর্ক তৈরির অনেক পরে এই পরিবর্তন ঘটে। ফরাসি গবেষক ড. টমাস কুকি এবং তাঁর সহকর্মীরা পূর্ব ফ্রান্সের ল্যাক ডে চ্যালিন নামক একটি প্রাচীন হ্রদের তীরবর্তী বসতির কুকুরের খুলির ভেতরের অংশ বিশ্লেষণ করেন। খুলির ভেতরের ফাঁপা অংশ থেকে তাঁরা বুঝতে পারেন, সেই কুকুরগুলোর মস্তিষ্ক আধুনিক নেকড়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ ছোট ছিল। শুধু শরীরের আকার ছোট হওয়ার কারণে এমন পার্থক্য হওয়া সম্ভব নয়। গবেষকরা আরও পুরোনো দুইটি প্রাচীন কুকুরসদৃশ প্রাণীর খুলিও পরীক্ষা করেন। একটি বেলজিয়ামের গোয়েট গুহা থেকে পাওয়া ৩৫,০০০ বছরের পুরোনো প্রাণী এবং অন্যটি দক্ষিণ ফ্রান্সের ১৫,০০০ বছরের পুরোনো নমুনা। আশ্চর্যের বিষয় হল, এদের কারোর মধ্যেই ছোট মস্তিষ্কের সেই বৈশিষ্ট্যটা দেখা যায়নি। এতে বোঝা যায়, কুকুরের মস্তিষ্ক ছোট হওয়ার প্রক্রিয়া গৃহপালিত হওয়ার শুরুতে নয়, বরং কৃষিভিত্তিক স্থায়ী মানবসমাজ গড়ে ওঠার পর শুরু হয়েছিল।

গবেষকেরা মনে করেন, স্থায়ী গ্রাম ও কৃষিভিত্তিক জীবনের আবির্ভাবই কুকুরের শরীর ও মস্তিষ্কে বড় পরিবর্তন আনে। সেই সময় গ্রামের চারপাশে ছিল মানুষের উচ্ছিষ্ট খাবার, গবাদি পশু, ধোঁয়া, শব্দ আর ভিড়ে ভরা ভিন্ন পৃথিবী। কুকুরদের আর প্রতিদিন নেকড়েদের মতো শিকার করতে হতো না; বরং মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খেয়েই তারা টিকে থাকতো।

বিজ্ঞানীদের মতে ছোট মস্তিষ্কের একটি বড় সুবিধা ছিল কম শক্তি খরচ। কারণ মস্তিষ্ক শরীরের সবচেয়ে বেশি শক্তি ব্যবহারকারী অঙ্গগুলোর একটি। যখন খাবার অনিশ্চিত, তখন কম শক্তিতে টিকে থাকতে পারার ক্ষমতা তাদের জন্য এক প্রকার বড় সুবিধাই ছিল। ফলে ধীরে ধীরে ছোট শরীর ও ছোট মস্তিষ্কের কুকুরের মনুষ্যসমাজে টিকে থাকার ক্ষেত্রে সুবিধা হয়েছিল।

তবে ছোট মস্তিষ্ক মানেই কম বুদ্ধিমান, বিজ্ঞানীরা এমনটাও বলেননি । বরং তারা বলছেন, কুকুরের বুদ্ধি অন্যভাবে বিকশিত হয়েছে। নেকড়েদের মতো স্বাধীন শিকারি হওয়ার বদলে তারা মানুষের মুখভঙ্গি পড়তে, ইশারা বুঝতে এবং মানুষের আবেগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসাধারণ দক্ষ হয়ে ওঠে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতাই কুকুরকে মানুষের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী প্রাণীতে পরিণত করেছে। গবেষণায় অস্ট্রেলিয়ার ডিঙ্গোদেরও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ডিঙ্গো হলো বন্য পরিবেশে ফিরে যাওয়া প্রাচীন গৃহপালিত কুকুরের বংশধর। তাদের মস্তিষ্কের আকার সাধারণ কুকুর ও নেকড়ের মাঝামাঝি একটা দশায় পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, একবার গৃহপালনের ফলে মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন ঘটে, তা সহজে আগের অবস্থায় ফিরে যায় না।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন, ঠিক কোন কারণটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল: খাবারের সংকট, মানুষের বেছে নেওয়া আচরণ, নাকি গ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা? তবে একটা বিষয় স্পষ্ট: মানব সভ্যতার উত্থান কুকুরকে শুধু বাহ্যিকভাবে নয়, ভেতর থেকেও বদলে দিয়েছিল। আর সেই পরিবর্তনের ইতিহাস আজও আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী প্রাণীটির অতীতকে নতুন করে চেনাচ্ছে।

 

সূত্র: https://doi.org/10.1098/rsos.252453

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 3 =