কুমেরুর লুকোনো ভূ-দৃশ্য

কুমেরুর লুকোনো ভূ-দৃশ্য

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬

কুমেরুর বরফের নীচে ঠিক কী কী ধরনের ভূদৃশ্য লুকিয়ে আছে ? প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই ভূবিজ্ঞান ও জলবায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম বড় অজানা অধ্যায়। বিজ্ঞানীরা অকপটে স্বীকার করেছেন যে, সৌরজগতের গ্রহ বুধ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান কুমেরুর তলদেশের চেয়ে বহু গুণ বেশি। সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণা সেই অজানা পর্দা অনেকটাই সরিয়ে দিয়েছে।

হেলেন অকেনডেন ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো মহাকাশ থেকে সংগৃহীত উচ্চ-রেজোলিউশনের উপগ্রহভিত্তিক উপাত্ত ব্যবহার করে কুমেরুর বরফের নীচের ভূপ্রকৃতির মানচিত্র তৈরি করেছেন। তাঁদের মূল কৌশলটি অত্যন্ত অভিনব। বরফ যখন নীচের শিলা ও ভূরূপের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন সেই বাধা ও ঢালের প্রভাব বরফের পৃষ্ঠে সূক্ষ্ম বিকৃতি সৃষ্টি করে। বরফের তলার ভূদৃশ্য ও বরফপ্রবাহের পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ ব্যবহার করে গবেষকেরা সেই বিকৃতিকে উল্টো পথে বিশ্লেষণ করেছেন।

এই নতুন মানচিত্রে (আই এফ পি এ মানচিত্র) উন্মোচিত হয়েছে এক বিস্ময়কর বৈচিত্র্যময় পৃথিবী। এই মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে খাড়া আল্পস সদৃশ উপত্যকা, গভীরভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হিমখাদ, বিস্তৃত নিম্নভূমি এবং স্পষ্ট ভূতাত্ত্বিক সীমারেখা। এসবের অনেকটাই আগেকার মানচিত্রে অনুপস্থিত বা অস্পষ্ট ছিল। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পূর্ববর্তী জরিপভিত্তিক মানচিত্রগুলোতে তথ্যের অভাবে ভূপ্রকৃতি কৃত্রিমভাবে মসৃণ দেখানো হতো; কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে তার বাস্তব রুক্ষতা ও বৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করা গেছে।

এই অগ্রগতির তাৎপর্য কেবল ভূতত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। বরফচাদরের নীচের ভূমির গঠন ও রুক্ষতাই নির্ধারণ করে বরফের গতি, স্থায়িত্ব এবং শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে কত দ্রুত বরফ প্রবাহিত হবে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ উচ্চতা নির্ণয়ের জন্য যে মডেলগুলো ব্যবহৃত হয়, এই নতুন মানচিত্র সেগুলোর নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এ এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।

একই সঙ্গে গবেষণাটি কুমেরুর ভূতাত্ত্বিক ও হিমবাহ-ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। বরফের নীচে সংরক্ষিত প্রাচীন নদীখাত, নির্বাচিত ক্ষয়প্রক্রিয়ার নিদর্শন এবং টেকটোনিক কাঠামো ইঙ্গিত দেয় যে আজকের বরফঢাকা স্থির চেহারার আড়ালে রয়েছে বহু মিলিয়ন বছরের জটিল ও গতিশীল ইতিহাস।

কুমেরুর এখনও আমাদের গ্রহের সবচেয়ে রহস্যময় অঞ্চলগুলোর একটি। এই গবেষণা দেখিয়ে দিল, আধুনিক স্যাটেলাইট ও পদার্থবিজ্ঞানের মেলবন্ধনে সেই রহস্য ভাঙা আর অসম্ভব নয়।

 

সূত্র: Complex mesoscale landscapes beneath Antarctica mapped from space by Helen Ockenden, Robert G. Bingham, et.al; published in Science ,15th January 2026, DOI: 10.1126/science.ady2532

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 + 14 =