কৃত্রিম উপগ্রহের ধ্বংসক্রিয়া বিশ্লেষণ 

কৃত্রিম উপগ্রহের ধ্বংসক্রিয়া বিশ্লেষণ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ নভেম্বর, ২০২৬

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ধ্বংস হল ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ই এস এ)-র দুটি উপগ্রহ। বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ জেট বিমানে চেপে আকাশ থেকেই পর্যবেক্ষণ করেন এই বিরল দৃশ্য। উপগ্রহ দুটির ধ্বংসপ্রক্রিয়া এবং তা থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থের প্রভাব নিরূপণ করা তাঁদের উদ্দেশ্য।

উপগ্রহ দুটি হল ট্যাঙ্গো ও সাম্বা। একসময় রুম্বা ও সালসা নামের আরও দুটি উপগ্রহের সঙ্গে মিলে এগুলি ই এস এ-র ক্লাস্টার মিশনের অংশ ছিল। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে সৌরবায়ুর মিথস্ক্রিয়া বোঝাই ছিল বিজ্ঞানীদের এই মিশনের উদ্দেশ্য। প্রায় ২৫ বছর কাজ করার পর উপগ্রহ দুটিকে পরিকল্পিতভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ফিরিয়ে আনা হয়। গত ৩১শে আগস্ট ও ১লা সেপ্টেম্বর, প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণাংশে টোঙ্গা দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি তাদের বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ ঘটে।

আন্তর্জাতিক গবেষক দলটির লক্ষ্য ছিল, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় উপগ্রহগুলি কীভাবে ভেঙে পড়ে, কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয় এবং সেগুলি বায়ুমণ্ডলের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা খতিয়ে দেখা। কারণ, আগামী দশকে স্পেসএক্স, অ্যামাজন ও ব্লু অরিজিনের মতো সংস্থা বিপুলসংখ্যক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে। ফলে ভবিষ্যতে বায়ুমণ্ডলে উপগ্রহ পুড়ে যাওয়ার ঘটনা অনেক বাড়তে পারে। অথচ এর পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখনও সীমিতই বলা চলে। ফলে, উপগ্রহের কতটা অংশ পুড়ে যায় এবং কতগুলি টুকরো পৃথিবীর মাটিতে এসে পড়তে পারে, তা নিয়েও একটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এই পর্যবেক্ষণের জন্য ৩০টি ক্যামেরা ও স্পেকট্রোমিটার বসানো একটি বিশেষ জেট বিমানে ছিলেন আটজন বিজ্ঞানী। ই এস এ -র পরিচালকদের দেওয়া নির্ভুল গতিপথের হিসাব অনুসরণ করে তাঁরা উপগ্রহ দুটির কাছাকাছি পৌঁছে যান। বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ঘণ্টায় প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার বেগে প্রবেশ করা উপগ্রহগুলি জ্বলতে শুরু করলে আকাশে উজ্জ্বল এক অগ্নিগোলকের সৃষ্টি হয়। গবেষক জিরি শিলহার বলেন, প্রথমে সেটিকে এক ছোট উজ্জ্বল আলোকবিন্দুর মতো দেখাচ্ছিল। পরে হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো উপগ্রহটি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৩০-৪০ সেকেন্ড ধরে সেই টুকরোগুলিকে বায়ুমণ্ডলে জ্বলতে দেখা যায়। ক্যামেরায় ধরা পড়ে কয়েক ডজন খণ্ডের গতিবিধি।

গবেষকদের বিশেষ আগ্রহ ছিল উপগ্রহ পুড়ে যাওয়ার সময় নির্গত সাতটি রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে টাইটানিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও অ্যালুমিনিয়ামকে ঘিরে। উপগ্রহের কাঠামোর প্রধান উপাদান অ্যালুমিনিয়াম। বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যাওয়ার সময় এটি অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডে পরিণত হতে পারে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বায়ুমণ্ডলে এই যৌগের পরিমাণ বেড়ে গেলে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওজোন স্তরের ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ ফিল্টার ব্যবহার করে বিভিন্ন উচ্চতায় অ্যালুমিনিয়ামের উপস্থিতি ও তার রাসায়নিক পরিবর্তন শনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।

এখন সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে উপগ্রহের ভাঙন ও দহনপ্রক্রিয়ায় প্রতি মুহূর্তে কী কী রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, তা বোঝার চেষ্টা করবেন গবেষকরা। এর মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা-সংক্রান্ত মডেল আরও উন্নত করা সম্ভব হবে। ক্রমবর্ধমান উপগ্রহশিল্প ভবিষ্যতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও জলবায়ুর ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

 

সূত্র: 2 satellites just burned up in Earth’s atmosphere — and scientists were watching from a private jet By Tereza Pultarova, Published September 8, 2026, “There was a sudden explosion as the satellites disintegrated.”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + three =