কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবৈধ ব্যবহার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবৈধ ব্যবহার

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ এপ্রিল, ২০২৬

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক মেশিন লার্নিং সম্মেলনের (ICML) সাম্প্রতিক একটি ঘটনা বৈজ্ঞানিক গবেষণার জগতে গভীর আলোড়ন তুলেছে। গবেষণাপত্রের পর্যালোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবৈধ ব্যবহারকে কেন্দ্র করে গবেষণার নৈতিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দায়িত্ববোধ—এই তিনটি বিষয়কে নিয়ে সূচনা হয়েছে বিতর্কের। সম্মেলন কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪৯৭টি গবেষণাপত্র বাতিল করেছে, যা মোট জমা পড়া প্রবন্ধের প্রায় ২ শতাংশ। কারণ, সংশ্লিষ্ট গবেষকরা সহ-গবেষণা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করে বৃহৎ ভাষা মডেল/ LLM (যেমন-জিপিটি-৪,চ্যাটজিপিটি,জেমিনি ইত্যাদি)-এর সহায়তা নিয়েছিলেন।

ICML-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো “পারস্পরিক পর্যালোচনা নীতি’’। অর্থাৎ , প্রতিটি গবেষককে নিজের প্রবন্ধ জমা দেওয়ার পাশাপাশি সমবিষয় সম্পর্কিত অন্য গবেষণাপত্র মূল্যায়নের দায়িত্বও নিতে হয়। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো গবেষকদের মধ্যে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও মান নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেকেই এই বিচারের দায়িত্ব এ আই-এর কাঁধে চাপিয়ে চটজলদি সমাধানের পথ বেছে নিয়েছেন।

এই অনিয়ম যে ভবিষ্যতে হতে পারে সেটা আন্দাজ করেই সেটা শনাক্ত করতে আয়োজকরা প্রযুক্তির মাধ্যমেই একটি চতুর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। পর্যালোচনার জন্য পাঠানো গবেষণাপত্রের মধ্যে গোপন চিহ্ন “watermark” যুক্ত করা হয়। সেটা কিন্তু সাধারণ পাঠকের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু যদি কেউ এ আই দিয়ে রিভিউ তৈরি করেন, তাহলে সেই লুকানো নির্দেশনা অনুসারে এ আই নির্দিষ্ট কিছু বাক্যাংশ তৈরি করে। এইসব “ফাঁস করে দেওয়া শব্দবন্ধ” বিশ্লেষণ করেই আয়োজকরা বুঝতে পারেন কোন রিভিউটি মানবসৃষ্ট, আর কোনটি যান্ত্রিক।

সম্মেলনের কর্তৃপক্ষরা জানিয়েছেন, এই কঠোর সিদ্ধান্তের লক্ষ্য শাস্তি দেওয়া নয়, বরং গবেষক সমাজের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস রক্ষা করা। কারণ, এ আই যতই উন্নত হোক, গবেষণার মর্মবস্তু এখনও মানবিক বিচার, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সততার ওপর নির্ভরশীল।

তবে এইধরনের পদক্ষেপকে ঘিরে গবেষক সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতে গবেষণার নৈতিক মান অক্ষত রাখতে সাহায্য করবে। কেউ কেউ প্রস্তাব দিয়েছেন, নিয়ম ভঙ্গকারীদের আরও কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত, যেমন ভবিষ্যতে প্রবন্ধ জমা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা। তবে সবাই কিন্তু একমত নন। অন্য এক দল মনে করেন, অতিরিক্ত কড়াকড়ি পর্যালোচকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে, ফলে তারা হয়তো ভবিষ্যতে আরও দায়সারা বা নিম্নমানের রিভিউ জমা দিতে পারেন।

বাস্তবতা হলো, এ আই ইতিমধ্যেই গবেষণা পর্যালোচনার প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, অর্ধেকেরও বেশি গবেষক নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও কোনো না কোনোভাবে এ আই ব্যবহার করছেন। এরফলে এ আই ব্যবহারের নৈতিকতা নিয়ে গবেষক মহলে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে।

সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব এড়াতে ICML একটি অভিনব সমাধানের পথ বেছে নিয়েছে। ICML প্রথমবারের মতো দুটি আলাদা সম-বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা পদ্ধতি চালু করেছে। একটিতে সীমিত এ আই ব্যবহার অনুমোদিত, অন্যটিতে সম্পূর্ণই নিষিদ্ধ। এবার থেকে গবেষকরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী পথ বেছে নেবেন।

 

এই ঘটনা কেবল একটি সম্মেলনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি গবেষণা জগতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। ভবিষ্যতে এ আই এবং মানববুদ্ধির সহাবস্থান কীভাবে নৈতিক ও দায়িত্বশীল পথে এগোবে—তারই এক প্রাথমিক রূপরেখা এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

সূত্র: Major conference catches illicit AI use and rejects hundreds of papers By Elizabeth Gibney, published in ‘Nature’ journal, 25th March 2026.

doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-00893-2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 15 =