পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে পরাগবাহী পোকামাকড়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিশ্বজুড়ে দ্রুত কমছে জীববৈচিত্র্য। এর মধ্যে পোকামাকড়ের সংখ্যা ও প্রজাতি পর্যবেক্ষণ করা বেশ কঠিন কাজ, কারণ প্রচলিত পদ্ধতিতে অনেক সময় পোকামাকড় মেরে পরীক্ষা করতে হয়। এবার সেই সমস্যার সমাধানে নতুন প্রযুক্তি আনলেন গবেষকেরা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রেডার ইমেজিং ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে জীবন্ত পোকামাকড়কে আলাদা করে শনাক্ত করা সম্ভব। এতদিন রেডার প্রযুক্তি মূলত আকাশের অনেক উঁচুতে একসঙ্গে উড়ে যাওয়া পোকামাকড় পর্যবেক্ষণে ব্যবহার হত। কিন্তু এবার মিলিমিটার-ওয়েভ রেডার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নির্দিষ্ট একটি পোকাকেও শনাক্ত করা যাচ্ছে। পোকামাকড় ডানা ঝাপটানোর সময় যে বিশেষ ধরনের রেডার প্রতিফলন তৈরি হয়, সেটিই বিশ্লেষণ করছে এই প্রযুক্তি। ডেনমার্কের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যাডাম নারবুডোভিচ বলেন, পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায় অ্যান্টেনা প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়েই প্রথমে ভাবনা শুরু হয়েছিল। পরে গবেষকেরা ‘মাইক্রো-ডপলার’ প্রযুক্তির ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। এই পদ্ধতিতে পোকামাকড়ের বাহ্যিক গঠন নয়, বরং ডানা ঝাপটানোর ছন্দ বিশ্লেষণ করা হয়। ডানার গতির ফলে যে-বিশেষ হারমোনিক প্যাটার্ন তৈরি হয় তার সাহায্যেই আলাদা করা যায় বিভিন্ন প্রজাতিকে। ক্যামেরায় যা ধরা যায় না, রেডার সেই সূক্ষ্ম বায়োমেকানিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে পারে। তাঁরা মেশিন লার্নিং মডেলের সঙ্গে SHAP নামে একটি Explainable AI টুল ব্যবহার করেছেন। এটি কোন বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা বিশ্লেষণ করে। ডানার ঝাপটার গতি, শক্তির বণ্টন, শব্দতরঙ্গের বৈশিষ্ট্যসহ একাধিক তথ্য সংগ্রহ করে মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই তথ্য সংগ্রহের জন্য ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন ক্যাম্পাসে বিভিন্ন পোকামাকড় ধরা হয়। পরে তাদের একটি প্লাস্টিকের বাক্সে রেখে মিলিমিটার-ওয়েভ অ্যান্টেনার মাধ্যমে রেডার সিগনেচার রেকর্ড করা হয়। পরীক্ষা শেষে সব পোকামাকড়কে আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি মৌমাছি ও বোলতাকে ৯৬ শতাংশ নির্ভুলভাবে আলাদা করতে পারে। এছাড়া পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরাগবাহী প্রজাতিকে প্রায় ৮৫ শতাংশ নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। নারবুডোভিচের কথায়, নির্ভুলতার এই উচ্চ মানটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়। বিভিন্ন প্রজাতির পোকামাকড় ভিন্ন ভিন্নভাবে ডানা ঝাপটায়, আর সেই পার্থক্য রেডারের প্রতিফলনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষের চোখে তা বোঝা না গেলেও প্রশিক্ষিত AI সেটা সহজেই ধরতে পারছে। তবে এখনও এই প্রযুক্তি পরীক্ষাগার-নিবদ্ধ। গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হল এটিকে ছোট আকারে তৈরি করে মাঠে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। কারণ বাস্তব পরিবেশে কোন প্রজাতির পোকা সেন্সরের উপর দিয়ে উড়ে গেল, তা নিশ্চিত করা অনেক কঠিন।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি “ফ্লাই-থ্রু” ডিভাইস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তাতে কোনও পোকামাকড় না মেরেই সহজে কম খরচে বিভিন্ন অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
সূত্র: PhysicsWorl ; May ; 2026
