কোয়ান্টাম ‘কোয়াডস্কুইজিং’  

কোয়ান্টাম ‘কোয়াডস্কুইজিং’  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ মে, ২০২৬

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক ঐতিহাসিক দিকচিহ্ন স্থাপন করলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁরা প্রথমবারের মতো ‘কোয়াডস্কুইজিং’/ চতুঃস্তরীয় কোয়ান্টাম সংকোচন নামে এক অত্যন্ত জটিল কোয়ান্টাম আন্তঃক্রিয়া বাস্তবে তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে এ এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো কণার অনিশ্চয়তাকে একদিকে কমিয়ে অন্যদিকে বাড়ানো যায়। এক্ষেত্রে একটি মাত্র খাঁচাবদ্ধ আয়ন বা বিশেষভাবে আটকে রাখা আয়ন ব্যবহার করে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এটি ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার, অতিনির্ভুল সেন্সর এবং উন্নত কোয়ান্টাম প্রযুক্তির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক জার্নাল নেচার ফিজিক্সে।

আমাদের চারপাশের বহু ভৌত ব্যবস্থাকে – যেমন স্প্রিংয়ের দোলন, আলোর তরঙ্গ— কোয়ান্টাম জগতে “কোয়ান্টাম হারমোনিক অসিলেটর’’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কম্পনশীল সিস্টেমগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা স্কুইজিং/সংকোচন নামে পরিচিত একটি কোয়ান্টাম কৌশল নিয়ে কাজ করছেন।

কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কণার অবস্থান ও ভরবেগের মতো দুটি বৈশিষ্ট্য একই সঙ্গে সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে জানা অসম্ভব। স্কুইজিং এই অনিশ্চয়তার ভারসাম্যকে নতুন করে সাজায়। একটি বৈশিষ্ট্যকে আরও নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা হয়, যদিও অন্যটি তুলনায় বেশি অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। এই প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকারী LIGO-এর মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ক্ষীণতম মহাজাগতিক কম্পন শনাক্ত করতে অতিমাত্রিক সংবেদনশীলতা প্রয়োজন।

তবে সাধারণ স্কুইজিংয়ের বাইরেও আরও জটিল স্তর রয়েছে, যেমন – ট্রাইস্কুইজিং এবং কোয়াডস্কুইজিং। এতদিন এগুলো ছিল মূলত তাত্ত্বিক ধারণা। কারণ উচ্চস্তরের এইসব কোয়ান্টাম প্রভাব স্বাভাবিকভাবে এতটাই দুর্বল যে পরীক্ষাগারে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ত। ফলে পরিবেশগত বাধা-বিঘ্নের মধ্যে সেগুলো খুব দ্রুত হারিয়ে যেত।

অক্সফোর্ডের গবেষকেরা এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে অভিনব একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তারা একটি বদ্ধ কণার উপর দুটি সূক্ষ্ম-নিয়ন্ত্রিত বল একসঙ্গে প্রয়োগ করেন। আলাদাভাবে প্রতিটি বল সাধারণ প্রভাব তৈরি করলেও, একত্রে তারা ক্রম-নির্ভরশীল কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন ও অনেক বেশি শক্তিশালী আন্তঃ ক্রিয়া সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, দুটি বলের পারস্পরিক প্রভাব এমন এক কোয়ান্টাম আচরণ তৈরি করে যা তাদের পৃথক পৃথক প্রভাবের সরল যোগফলের থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী।

এই পদ্ধতির সাহায্যে গবেষকেরা একই পরীক্ষামূলক আয়োজন ব্যবহার করে স্কুইজিং, ট্রাইস্কুইজিং এবং ইতিহাসে প্রথমবার কোয়াডস্কুইজিং সফলভাবে তৈরি করেন। শুধু তাই নয়, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই চতুর্থ-স্তরের আন্তঃ ক্রিয়া তারা ১০০ গুণেরও বেশি দ্রুত সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে বদ্ধ আয়নের কোয়ান্টাম গতির সূক্ষ্ম গঠন বিশ্লেষণ করে তারা এই নতুন আন্তঃক্রিয়ার স্পষ্ট প্রমাণও পান।

বিজ্ঞানীদের মতে, এটি এমন এক প্রযুক্তিগত কৌশলের সূচনা, যা এতদিন নাগালের বাইরে থাকা কোয়ান্টাম ঘটনাগুলোকেও বাস্তবে অনুসন্ধানের সুযোগ করে দেবে। ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আরও জটিল কোয়ান্টাম সিমুলেশন, অতি-সংবেদনশীল পরিমাপ প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির পথ উন্মুক্ত হতে পারে।

 

সূত্র: Squeezing, trisqueezing and quadsqueezing in a hybrid oscillator-spin system, O Băzăvan et al, Nature Physics, 1 May 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − one =