গণিতের অপরাজেয় প্রতিভা ইতাঙ ঝাং

গণিতের অপরাজেয় প্রতিভা ইতাঙ ঝাং

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৭ জুন, ২০২৬

চীনা গণিতবিদ ইতাঙ ঝাং-এর জীবনকাহিনি আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসের এক অসামান্য উদাহরণ। তাঁর জন্ম ১৯৫৫ সালে সাংহাইয়ে। খুব ছোটবেলা থেকেই গণিতে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি নিজেই পিথাগোরাসের উপপাদ্যের একটি প্রমাণ খুঁজে বের করেছিলেন। তৎসত্ত্বেও তাঁর প্রতিভার বিকাশের পথ কিন্তু সহজ ছিল না।

চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব তাঁর শিক্ষাজীবনে বড় আঘাত হানে। ওই সময় স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, আর রাজনৈতিক সমস্যার কারণে তাঁর পরিবারও বিপদের মুখে পড়ে। ঝাংকে মায়ের সঙ্গে গ্রামে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ ছিল না, তবুও তিনি সুযোগ পেলেই গণিতের বই নিয়ে চর্চা করতেন।

বিপ্লব শেষ হওয়ার পর ২৩ বছর বয়সে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চীনের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত অধ্যয়ন শুরু করেন। পরে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে একটি পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচ ডি করতে যান।

কিন্তু পিএইচ ডি ডিগ্রি অর্জনের পর তাঁর জীবন আবারও এক কঠিন মোড় নেয়। গবেষণার পরিচালকের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় তিনি প্রয়োজনীয় সুপারিশপত্র পাননি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাওয়ার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে হিসাবরক্ষক, ডেলিভারি কর্মী এমনকি সাবওয়েতে স্যান্ডউইচ বানানোর কাজও করতে হয়। সাত বছর ধরে তিনি এই সব কাজ করেছেন, অথচ তিনি ছিলেন গণিতের উচ্চ ডিগ্রিধারী!

অবশেষে ১৯৯৯ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারে একজন সাধারণ লেকচারারের কাজ পেলেন। সেখানে গবেষণার জন্য তেমন অর্থ, সহযোগী বা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন কিছুই ছিল না। তবুও তিনি একা একা নিজের কাজ একাগ্রচিত্তে চালিয়ে যান।

তাঁর লক্ষ্য ছিল সংখ্যাতত্ত্বের অন্যতম বিখ্যাত অমীমাংসিত সমস্যা টুইন প্রাইম অনুমান (Twin Prime Conjecture)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রশ্নের সমাধান। এই অনুমান অনুযায়ী, ৫ / ৭, ১৭ /১৯-এর মতো দুই ব্যবধানবিশিষ্ট মৌলিক সংখ্যার জোড়ার সংখ্যা অসীম। গণিতবিদেরা ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু সফল হননি।

২০১৩ সালে ঝাং একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তিনিও সরাসরি টুইন প্রাইম অনুমান প্রমাণ করতে পারেননি, কিন্তু দেখিয়েছিলেন যে অসীম সংখ্যক মৌলিক সংখ্যার জোড়া রয়েছে যাদের মধ্যকার ব্যবধান ৭ কোটি (৭০ মিলিয়ন)-এর কম। ইতিহাসে এই প্রথমবার প্রমাণ হল যে মৌলিক সংখ্যাগুলোর মধ্যে কোনো সসীম ব্যবধান অসীমবার দেখা দেয়।

এই আবিষ্কার গণিতজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাঁর গবেষণাপত্র বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও কঠোর বাছাইয়ের জন্য প্রসিদ্ধ জার্নাল Annals of Mathematics-এ জমা দেওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে গৃহীত হয়। এটাও অত্যন্ত বিরল ঘটনা। পরে অন্যান্য গবেষকেরা তাঁর পদ্ধতির উন্নতি করে ব্যবধানটিকে আরও অনেক কমিয়ে আনেন।

 

ইতাঙ ঝাংয়ের গণিতিক সাফল্যের ইতিহাস প্রমাণ করে যে প্রতিভা ও অধ্যবসায় কখনও কখনও প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা, দারিদ্র্য এবং দীর্ঘ অবহেলাকেও পরাজিত করতে পারে। সাত বছর স্যান্ডউইচ বানিয়ে সংসার চালানো সেই মানুষটিই শেষ পর্যন্ত এমন এক গাণিতিক অগ্রগতি ঘটান, যা বহু প্রসিদ্ধ বিশেষজ্ঞের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

 

 

সূত্র: mathematics learning

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + 12 =