গাণিতিক নিশ্চয়তার ভ্রম

গাণিতিক নিশ্চয়তার ভ্রম

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

মানুষের কাছে গণিত মানেই অবিচল সত্যের রূপ। একবার কোনো উপপাদ্য প্রমাণিত হওয়া মানে সেটা যুগ যুগ ধরেই সত্য। কিন্তু গণিতবিদ ও লেখক অ্যাডাম কুচারস্কি তাঁর বই ‘’Proof: The Art and Science of Certainty ‘’ লিখতে গিয়ে আবিষ্কার করেন, বাস্তবে গণিতের ইতিহাসও সংশয়, বিভ্রান্তি ও অস্বস্তিকর সত্যে ভরা। শুধু তাই নয়, আধুনিক প্রযুক্তি ও সমাজেও দৃঢ় নিশ্চয়তা বিপজ্জনক ভ্রমে পরিণত হতে পারে।

ঊনবিংশ শতকের আগে ইউরোপীয় গণিত মূলত প্রকৃতির দৃশ্যমান নিয়ম দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। মানুষ চারপাশের জগত দেখে ধরে নিয়েছিল, কিছু বিষয় তো স্পষ্টই সত্য—যেমন গোটা জিনিস সবসময় অংশের চেয়ে বড় হবে, অথবা কোনো বস্তুর গতি মসৃণ ও ধারাবাহিক হবে। এই ধারণাগুলো এত গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল যে সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনই কেউ অনুভব করত না।

কিন্তু যখন গণিতবিদেরা অসীম, বিমূর্ত মাত্রা ও জটিল ফাংশনের জগতে প্রবেশ করলেন, তখন সেই পুরোনো বিশ্বাস ভাঙতে শুরু করল। তারা দেখলেন, কিছু ক্ষেত্রে একটি অংশ গোটা বস্তুর সমান আকারের হতে পারে। আবার এমন ফাংশনও আছে, যা কোথাও মসৃণ নয়, অর্থাৎ কোনো বিন্দুতেই সাধারণভাবে তার পরিবর্তনের হার নির্ণয় করা যায় না। এই ধরনের উদাহরণ তৎকালীন অনেক পণ্ডিতের কাছে ছিল অস্বাভাবিক ও ভীতিকর। তারা এসব ধারণাকে সাধারণ বুদ্ধির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে আখ্যা দেন।

কিন্তু গণিতের এককালের ইতিহাসই দেখাল, এই তথাকথিত সাধারণ বুদ্ধির বিপরীত স্রোতে ভাসা ধারণাই ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। আজকের জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক জ্যামিতিক নিয়মের ওপর নির্ভরশীল। সম্ভাব্যতা তত্ত্বও অনেকাংশে অনিশ্চয়তা, বিশৃঙ্খলা ও অনির্দেশ্য পরিবর্তনের ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যেসব ধারণাকে একসময় অযৌক্তিক মনে হতো সেগুলোর বেশিরভাগই আজকের বিজ্ঞানের ভিত্তি।

কুচারস্কি বলেন, গণিতের বিকাশ সব সভ্যতায় একইভাবে ঘটেনি। ইউরোপ দীর্ঘদিন ঋণাত্মক সংখ্যাকে অস্বাভাবিক মনে করলেও চীনে বহু আগেই তার ব্যবহার শুরু হয়েছিল। কারণ সেখানে গণিতের ব্যবহার ছিল বাস্তব লেনদেন, সম্পদ ও ঋণের হিসাবের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ঋণ বোঝাতে ঋণাত্মক সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আসল কথা হল, সত্যকে আমরা অনেক সময় সংস্কৃতি ও অভ্যাসের চোখ দিয়েই বিচার করি।

এরপর লেখক আলোচনাকে নিয়ে যান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ আই-এর জগতে। এ আই আজ ছবি চিনতে পারে, ভাষা বুঝতে পারে, জটিল খেলা জিততে পারে। কিন্তু আধুনিক এ আই অত্যন্ত উন্নত হলেও মাঝে মাঝে অবিশ্বাস্যরকম অতি সাধারণ ভুল করে বসে। যেমন, কোনো ছবিতে সামান্য ডিজিটাল চিহ্ন যোগ করলে এ আই একটি পান্ডাকে গিবন বানর বলে চিহ্নিত করে! প্রশ্ন হলো, এত শক্তিশালী সবজান্তা প্রযুক্তি এমন হাস্যকর ভুল কেন করে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এ আই গবেষক টনি ওয়াং ও তাঁর সহকর্মীরা বিখ্যাত বোর্ড গেম গো-এর ওপর পরীক্ষা চালান। গো এমন একটি খেলা, যেখানে সাম্প্রতিক দশকে এ আই, সেরা মানুষ খেলোয়াড়দেরও হারিয়ে দিয়েছে। গবেষকেরা এবার এমন একটি পাল্টা অ্যালগরিদম তৈরি করেন, যার কাজ হল সেরা এ আই খেলোয়াড়দের দুর্বলতা খুঁজে বের করা।

শেষ পর্যন্ত তারা এমন দুটি অদ্ভুত কৌশল খুঁজে পান, যা ব্যবহার করে এ আই-কে হারানো সম্ভব। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব কৌশলে একজন সাধারণ মানুষ খেলোয়াড কিন্তু এত সহজে প্রতারিত হন না। অথচ তথাকথিত অতিমানব এ আই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল যে সে জিতবে, তারপর হেরে যায়। তার অর্থ, শুধু বেশি শক্তিশালী বা বেশি চিন্তাদক্ষ এ আই বানালেই সব সমস্যা মিটবে না। উচ্চ বুদ্ধিমত্তা মানেই নির্ভুল বিচার নয়। কোনো একটা ব্যবস্থা যত উন্নতই হোক, তার অদেখা দুর্বলতা থাকবেই। প্রযুক্তির শক্তি যত বাড়ে, তার সীমাবদ্ধতা বোঝাও তত জরুরি হয়ে ওঠে।

লেখক এরপর সত্য ও মিথ্যার সামাজিক লড়াইয়ের প্রসঙ্গে আসেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে গুজব, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকেই মনে করেন, মানুষের একটা বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত বিশ্বাসপ্রবণতা। কিন্তু কুচারস্কি বলেন, বিপদ কেবলমাত্র সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ যদি সবকিছুতেই সন্দেহ করতে শেখে, তবেও সমান ক্ষতি হতে পারে। মানুষকে যদি একপেশেভাবে বলা হয় সমাজ মাধ্যম মানেই ভুয়ো , সামাজিক মাধ্যমের কিছুই বিশ্বাস করো না, তাহলে হয়তো তারা মিথ্যা থেকে কিছুটা দূরে থাকবে একথা ঠিক। কিন্তু একই সঙ্গে সে প্রকৃত সত্য তথ্যের ওপরও আস্থা হারাবে। গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ এখনো ভুয়ো উৎসের চেয়ে বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেই বেশি যুক্ত থাকে। তাই সবকিছুকে সন্দেহ করতে শেখানোটাও বিপজ্জনক।

বিংশ শতাব্দীর একেবারে প্রথম দিকের ফরাসি গণিতবিদ আঁরি পোআঁকারে একবার বলেছিলেন, “সবকিছু বিশ্বাস করা যতটা সহজ, সবকিছুকে সন্দেহ করাও ঠিক ততটাই সহজ প্রবৃত্তি।‘’ মোটকথা আমরা হয় অন্ধ বিশ্বাসে পড়ি, নয়তো অহেতুক সন্দেহে।

আজকের পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এত জটিল যে একজন মানুষ সবকিছু নিজে যাচাই করতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্থনীতি—এসব ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতেই হয়। তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু এ নয় যে সত্য কী, কে বিশ্বাসযোগ্য সেটিও বড়ো প্রশ্ন।

নিশ্চয়তাই সবসময় নিরাপদ লক্ষণ নয়, আবার সন্দেহও সবসময় প্রজ্ঞার চিহ্ন নয়। সত্যের কাছে পৌঁছাতে হলে দরকার যুক্তিবোধ, প্রশ্ন করার সাহস এবং ঠিক পক্ষে আস্থা রাখার ক্ষমতা।

 

সূত্র: When Monsters Came for Mathematics, Adam Kucharski’s 3 greatest revelations while writing Proof: The Art and Science of Certainty By Adam Kucharski, 4:50 AM GMT-5 on June 13, 2025, published in Nautilus.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × one =