প্রায় দুই শতাব্দী পর দৈত্যাকার কচ্ছপের পদচারণায় আবারও প্রাণ ফিরে পেল গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের ফ্লোরিয়ানা দ্বীপ। ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায় পেরিয়ে, এই দ্বীপে ফিরে এসেছে সেই হারিয়ে যাওয়া দৈত্যাকার কচ্ছপ। এদের অনুপস্থিতিতে প্রকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ভেঙে পড়েছিল। সংরক্ষণবিদদের মতে, এটি কেবল কোনো একটি প্রজাতির প্রত্যাবর্তন নয়; বরং বিশ্বের সংরক্ষণ ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
সম্প্রতি ১৫৮টি বন্দী অবস্থায় লালিত কিশোর দৈত্যাকার কচ্ছপকে ফ্লোরিয়ানার প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগটি গ্যালাপাগোস জাতীয় উদ্যান অধিদপ্তরের নেতৃত্বাধীন ফ্লোরিয়ানা বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অংশ।
ফ্লোরিয়ানার নিজস্ব প্রজাতি, চেলোনয়ডিস নাইজার নাইজার , ঊনবিংশ শতাব্দীর ১৮৪০-এর দশকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার সময় খাদ্যের জোগান বজায় রাখার জন্য নাবিকরা হাজার হাজার কচ্ছপকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় এদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে মুছে যায়। এদের হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপের বাস্তুতন্ত্রও ধীরে ধীরে ভারসাম্য হারায়।
তবে আশার আলো দেখা যায় ২০০৮ সালে, যখন বিজ্ঞানীরা ইসাবেলা দ্বীপের উলফ আগ্নেয়গিরি অঞ্চলে এমন কিছু কচ্ছপের সন্ধান পান, যাদের শরীরে ফ্লোরিয়ানা প্রজাতির জিনের উত্তরাধিকার রয়ে গেছে। এই আবিষ্কার ঘিরেই ২০১৭ সালে শুরু হয় “ব্যাক-ব্রিডিং” কর্মসূচি। যার লক্ষ্য ছিল জিনগতভাবে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সংকর কচ্ছপদের নির্বাচন করে প্রজননের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া উপপ্রজাতির বৈশিষ্ট্য পুনরুদ্ধার করা।
গবেষকরা ২৩টি সংকর কচ্ছপ বেছে নিয়ে সান্তা ক্রুজ দ্বীপে বন্দী প্রজনন কর্মসূচি শুরু করেন। দীর্ঘ আট বছরের প্রচেষ্টায় ২০২৫ সালের মধ্যে ৬০০-রও বেশি বাচ্চা জন্ম নেয়, যাদের মধ্যে কয়েক শোটি এখন বন্য পরিবেশে টিকে থাকার উপযোগী।
গ্যালাপাগোস কন্সারভেসান ট্রাস্ট (জি সি টি) এই ঘটনাকে বিশ্বব্যাপী দ্বীপ পুনরুদ্ধার প্রকল্পগুলোর জন্য আশাব্যঞ্জক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ড. জেন জোন্স এটিকে “রোমাঞ্চকর ও শিহরণ জাগানো” মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, দুই দশকের বৈজ্ঞানিক অধ্যবসায়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এই সাফল্যকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
দৈত্যাকার কচ্ছপদের বলা হয় “ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার” বা বাস্তুতান্ত্রিক প্রকৌশলী। তারা চলাফেরা ও খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে দেয়, ঝোপঝাড় নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভূমির গঠন পরিবর্তন করে, ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফ্লোরিয়ানায় তাদের প্রত্যাবর্তন কেবল অতীতের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা নয়। এটি ভবিষ্যতের জন্য এক নবজাগরণের সূচনা। সুদীর্ঘ পরিকল্পনা ও সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে প্রকৃতিকে আবারও তার হারানো ছন্দ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
সূত্র: Giant tortoises return to Galápagos island after nearly 200 years by Jessica Rawnsley, BBC, 22nd February 2026.
